In the Mood for Love আমার কাছে দুটি চরিত্রের একটি নীরব ওয়াল্টজ : ওং কার ওয়াই

প্রশ্ন: আপনার সিনেমাগুলোর শিরোনাম অনেক সময়েই গল্পের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। যেমন, “Happy Together” একটি সমকামী যুগলের বিচ্ছেদের গল্প, আর “In the Mood for Love” সিনেমাটির মূল চরিত্ররা যেন ভালোবাসা এড়াতেই চায়।

ওং কার ওয়াই: “In the Mood for Love”-এর আসল চীনা নামটা অনুবাদ করা খুব কঠিন। সেটি অনেক বেশি কাব্যিক, মানুষের জীবনের সোনালি সময়, বিশেষ করে একজন নারীর যৌবনের পূর্ণ প্রস্ফুটনের ছবি আঁকে। যখন সিনেমাটি কানে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল, তখন ইংরেজি শিরোনাম খুঁজছিলাম।

দলের অনেকে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কোনোটাই ঠিক মানানসই মনে হচ্ছিল না। হঠাৎ একদিন আমি একটা রেকর্ডের দোকানে গিয়ে ব্রায়ান ফেরির গাওয়া “In the Mood for Love” নামক একটি অ্যালবাম দেখতে পাই। তখন ভাবলাম, এটাও তো খারাপ নয়।

এই গানটা ষাটের দশকের, ঠিক যে সময়ে সিনেমার গল্পও বসানো। আসলে সিনেমাটা প্রেম নিয়ে নয়, প্রেমের ‘মুড’ বা আবহ নিয়ে। সবাই শিরোনামটা পছন্দ করলো, তাই সেটাই রাখা হলো।

প্রশ্ন: ষাটের দশকের প্রতি আপনার এমন টান কেন? “Days of Being Wild”-এও সেই সময়কালকে তুলে ধরেছেন। আপনি তো বলেছিলেন, “In the Mood for Love” সেই সময়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

ওং কার ওয়াই: আমি আসলে চল্লিশের দশকেও ফিরে যেতে চাই, কিন্তু তা করা খুব ব্যয়বহুল আর জটিল। ষাটের দশক আমার শৈশবের সময়। সেসব স্মৃতির মাঝে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। এটা নির্মাতাদের একটা বিশেষ সুবিধা—চাইলেই তারা সময়ে ভ্রমণ করতে পারে। যেই সময়কে ফিরে পেতে চাই, সেটাকেই সিনেমায় ধারণ করি।

প্রশ্ন: “In the Mood for Love” এবং “Days of Being Wild” দুই সিনেমাই ষাটের দশকে ভিত্তি করে নির্মিত। এদের মধ্যে কি কোনো সংযোগ আছে?

ওং কার ওয়াই: অনেকে ধরে নেয় এটা “Days of Being Wild”-এর সিকুয়েল। কিন্তু এটি ভিন্ন গল্প। শুরুতে আমরা চেষ্টা করেছিলাম ভিন্ন রাখার। কিন্তু এক সময় মনে হলো, এত আলাদা করেও কী লাভ? কিছুটা সংযোগ থাকতে পারে। যদিও এটা “Days of Being Wild part two” নয়, তবে একে তার এক্সটেনশন বলা যেতে পারে।

ম্যাগি চুং (অভিনেত্রী) যখন হাউসওয়াইফ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, তখন তিনি সংযোগটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, “তুমি তো Days of Being Wild-এ খুব স্বাভাবিক অভিনয় করেছিলে। সেটাও তো একই সময়কাল।” তিনি বলেন, “তখন আমি তরুণী ছিলাম, এত সাজতে হতো না।” আমি তখন বলি, “তুমি ভাবো তুমি সেই একই মানুষ, শুধু দশ বছর পরে।” তার নামটাও আমরা একই রেখেছিলাম। তখন থেকে তিনি চরিত্রটা ধরতে পেরেছিলেন।

প্রশ্ন: সিনেমাটিতে কোনো যৌন দৃশ্য নেই, কিন্তু একটি দৃশ্য শুট করা হয়েছিল। কেন তা বাদ দেওয়া হলো?

ওং কার ওয়াই: আমি শুরুতেই সেই দৃশ্যটি শুট করি, যাতে অভিনেতা-অভিনেত্রী বুঝতে পারেন তাদের সম্পর্কের ধরণটা কেমন। এই দৃশ্যের পর তারা চরিত্রগুলোর ভেতর রসায়ন অনুভব করতে পারে হাটা, তাকানো, আচরণ সব বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত দৃশ্যটা কেটে ফেলি, কিন্তু সেই রসায়ন থেকেই যায়। “Happy Together”-এও ঠিক এমন করেছিলাম। প্রথম দিনেই প্রেমের দৃশ্য। যেন তারা মুখোমুখি হয় তারা প্রেমে জড়ায়, না শুধু দৈহিক সম্পর্ক করে।এটা কিন্তু পার্থক্য গড়ে দেয়।

প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান সিনেমাটোগ্রাফার ক্রিস্টোফার ডয়েলের সঙ্গে কাজ করছেন। আপনার সিনেমা ভিজ্যুয়ালি খুব শক্তিশালী। আপনার গ্রাফিক ডিজাইনের পটভূমিও আছে। আপনার কাছে ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ওং কার ওয়াই: আমি যা সামনে দেখি, তা থেকেই প্রতিক্রিয়া দিই জায়গাটা, মুখগুলো—সব মিলিয়ে যদি ভালো লাগে, তখন মনে হয় ঠিক আছে। অবশ্যই গ্রাফিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ সহায়তা করে। কিন্তু শুধু দেখতে ভালো হলেই হয় না, আমরা দৃশ্যের গতি, কাঠামো এসব নিয়েও অনেক কাজ করি।

যেমন, “Yumenji’s theme” ১৯৭২ সালে তৈরি জাপানি সুরকার উমেবায়াশি শিগেরুর সুর করা একটি ওয়াল্টজ। গানটা বারবার সিনেমায় বাজে। আমি সেটি শুনিয়ে অভিনেতা আর সিনেমাটোগ্রাফারকে সিনেমার ‘মুড’ বোঝাতে চেয়েছিলাম। সিনেমাটাকে আমি এই দুই চরিত্রের মাঝে একটা নাচ, এক ধরনের ওয়াল্টজ মনে করি ।

প্রশ্ন: আপনার তো অনেক ফুটেজ তৈরি হয়, “In the Mood for Love”-এরও চার ঘণ্টা শুটিং ছিল। তারপর কেটে ৯০ মিনিটের সিনেমা বানানো কি কঠিন?

ওং কার ওয়াই: বেশিরভাগ নির্মাতারা এডিটিংয়ে জিনিস গঠন করেন, একত্র করে কিছু তৈরি করেন। আর আমরা যা করি, তা হলো ধ্বংস। যেটা দরকার নেই তা বাদ দিই। প্রতিটি দৃশ্যকে দেখি, এটা কি দরকার? যেমন, প্রেমের দৃশ্য, আমরা বললাম দরকার নেই, কেটে দিলাম। এটা কষ্টের, কারণ অনেক ভালো জিনিস বাদ দিতে হয়। আর পরে মন চায়, সবাইকে সেই না-থাকা জিনিসগুলোও দেখাতে।

প্রশ্ন: আপনি এখন “2046” নামে একটি সিনেমা বানাচ্ছেন। নামটি রাজনৈতিক, হংকংয়ের জন্য নির্ধারিত “বেসিক ল’ ৫০ বছর পর, অর্থাৎ ২০৪৬ সালে শেষ হবে।

ওং কার ওয়াই: হ্যাঁ। আমি ভাবছিলাম, ধরে নিই হংকং ৫০ বছর একই রকম থেকে গেলো, কিন্তু পৃথিবী বদলাতে লাগলো। সিনেমাটা হবে পরিবর্তন নিয়ে।কারণ হংকংয়ের মানুষ পরিবর্তনকে ভয় পায়। এটি একটি ভবিষ্যতের সিনেমা হবে, যেখানে হংকং, চীন, জাপান, কোরিয়া, এমনকি ইউরোপেরও অভিনেতারা থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন