বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি উপনিবেশ কীভাবে ভারত কে ভাঙলো?

ঔপনিবেশিক ইতিহাসে “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি” শুধু একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয় এটি ছিলো একটি পরীক্ষাগার, যেখানে ব্রিটিশরা উপমহাদেশের উপর আধিপত্য কায়েমের মডেল তৈরি করে। এই প্রেসিডেন্সির গঠনের মধ্য দিয়েই যে ধরনের ভাষা, শ্রেণি, ধর্ম, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজনের মাধ্যমে।

১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় “দিওয়ানি” বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। এটি শুধু অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নয়, গভীর প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক দখলের সূচনা ছিল। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই গঠিত হয় “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি” যার আওতায় আসতো আজকের বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও অসমের কিছু অংশ। এটি ছিল বৃটিশদের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক একক, যেখানে শাসনের কাঠামো, কর-নীতি, এবং বিচারব্যবস্থার উপনিবেশিক প্যাটার্ন প্রথম বাস্তবায়িত হয়।

লর্ড ম্যাকলের “Minute on Indian Education” (১৮৩৫) অনুসারে, ইংরেজি শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলা হয় যারা “রক্তে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তায় ও মানসে ইংরেজ।” এই শ্রেণি, মূলত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে গড়ে ওঠা নববঙ্গীয় মধ্যবিত্ত, অচিরেই প্রশাসনের নানান স্তরে স্থান পায়। কিন্তু এই শিক্ষানীতির মাধ্যমে গ্রামবাংলার কৃষক ও মুসলমান সমাজ বাইরে পড়ে যায়, উচ্চবর্ণ হিন্দু শিক্ষিত শ্রেণি একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠে শিক্ষিত বনাম অশিক্ষিত, হিন্দু বনাম মুসলিম এবং নগর বনাম গ্রাম বিভাজন, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিভাজনের রূপ নেয়।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার সময় ব্রিটিশরা বাংলার মুসলমানদের ভিন্নতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে যায় । পূর্ব বাংলা ও আসামকে আলাদা করে মুসলমান-প্রধান একটি প্রদেশ গঠন করা হয়, যাতে মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ অনুগত মনোভাব গড়ে ওঠে এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া রোধ হয়।

তবে বেশ কিছু সংকট এই বিভাজন আরও গভীর করে তোলে। মুসলমানদের কাছে “পূর্ব বাংলা” হয়ে উঠে সম্ভাবনার প্রতীক। হিন্দু সমাজের কাছে এটি ছিল জাতীয়তাবাদের ওপর আঘাত। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও মানসিক বিভাজন থেকে যায় এবং “হিন্দু-মুসলিম” দ্বৈরথ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। সব শিল্প, শিক্ষা, বিচার, প্রশাসন কেন্দ্রীভূত ছিল এখানে। ফলে পূর্ববঙ্গের মানুষ উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বে উপেক্ষিত থাকে। মুসলিম কৃষক ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি ‘জাতীয় রাজনীতি’ থেকে দূরে সরে যায়। এখান থেকেই জন্ম নেয় মুসলিম লীগের মতো দল, যারা পূর্ববঙ্গের বঞ্চনার প্রশ্নকে ব্যবহার করে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জোরদার করে।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সময় ব্রিটিশরা ফারসি বাদ দিয়ে বাংলা ও ইংরেজি চালু করে। কিন্তু এই বাংলা ভাষা ছিল উচ্চবর্ণ হিন্দু দ্বারা নির্মিত যেখানে মুসলমান সমাজের আঞ্চলিক ভাষা, ধারা, রীতি একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে যায়। এই সাংস্কৃতিক বৈষম্য বহু মুসলমানের মধ্যে নিজস্বতা হারানোর ভয় গড়ে তোলে। এই চিন্তাগুলো পরবর্তীতে উঠে আসে আবুল কালাম আজাদ ও খিলাফত আন্দোলনের ভাষ্যকারদের মধ্যে যারা নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে দেখাতে থাকেন।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ভিতরেই ১৯৪৬ সালে ঘটে “Great Calcutta Killings”, যা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বাংলাকে ভেঙে পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ) এবং পশ্চিমবঙ্গ (ভারতের অন্তর্ভুক্ত) দুই ভাগ করা হয়। এই বিভাজন শুধুই ধর্মীয় ছিল না বরং উপনিবেশিক প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শ্রেণিবৈষম্যের দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল এমন এক সাংস্কৃতিক অঞ্চল, যেখানে একদিকে গড়ে উঠেছিল বাংলাভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, অপরদিকে ধর্মভিত্তিক পরিচয়ও ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, নজরুল, শামসুর রাহমান সকলেই বাঙালিত্বকে কেন্দ্র করে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাষা নির্মাণ করেন, কিন্তু ঔপনিবেশিক বিভাজন এই সাংস্কৃতিক ঐক্যকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় সীমারেখায় রূপান্তরিত করে।

বাংলাভাষী হওয়া সত্ত্বেও একজন মুসলমান ও একজন হিন্দু বাঙালি আলাদা আলাদা রাজনৈতিক অভিজ্ঞান নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই দ্বৈততা বাংলা ভাষাভাষীদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে দুর্বল করে এবং ভারত ভাগের সময় ধর্ম চূড়ান্ত বিভাজকের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুই বাংলার সমাজে এখনো সেই ঐতিহাসিক বিভাজনের ছায়া রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল, পাঠ্যবই, ইতিহাসচর্চা সবখানেই অতীতের সেই প্রশাসনিক বিভক্তি ও সাংস্কৃতিক শেকড় নিয়ে টানাপড়েন চলছেই। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি শুধু এক সময়কার উপনিবেশ নয়, এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিভক্তির প্রতীক, যার অভিঘাত ইতিহাস ছাড়িয়ে আজও সমাজ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিলো মূলত এক উপনিবেশিক প্রকল্পের প্রতীক, যেখানে শাসনের নামে বিভাজন, উন্নয়নের নামে বৈষম্য এবং শিক্ষার নামে শ্রেণিবিচ্ছেদ তৈরি করা হয়। এই অঞ্চলটি শুধু প্রথম উপনিবেশ ছিল না, এটি ছিল সেই জমিন, যেখানে ভারত ভাগের বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন