১৯৬০-এর দশকে জেরুজালেমে নাজি যুদ্ধাপরাধী আদলফ আইখম্যানের বিচার অনুষ্ঠানে বিশ্ববাসী চমকে ওঠে । ওই ব্যক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী জার্মানির পক্ষ থেকে এক লক্ষের বেশি ইহুদিকে হত্যা ও মৃত্যুবরণে পাঠানোর জন্য দায়ী ছিলেন। তবে আইখম্যানের বিচার শোনার পর আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তিনি কোনো জঘন্য, অসাধারণ মনুষ্যত্বহীন খলনায়ক ছিলেন না, বরং স্বাভাবিক একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তৎকালীন দার্শনিক ও সাংবাদিক হান্না আরেন্ডট তৈরি করেন তার বিখ্যাত ধারণা “Banality of Evil”।
“Banality of Evil” কি?
সাধারণ ভাবনায় আমরা ভয়ঙ্কর অপরাধ বা অত্যাচার বোঝার সময় অনেক সময় কালো চশমা পরে খলনায়ক বা অসাধারণ ব্যক্তিকে কল্পনা করি। কিন্তু আরেন্ডট দেখিয়েছিলেন যে, অনেক বড় ও ভয়ানক অপরাধও হতে পারে একদম সাধারণ মানুষের মধ্য দিয়ে, যারা নিজেকে কোনো অতি দুষ্ট চরিত্র মনে করে না। বরং তারা হয়তো এমনকি তাদের কাজের নৈতিকতার ব্যাপারে গভীর চিন্তাও করেন না।
“Banality of Evil” ধারণা মূলত বলে যারা বড় বড় মানবতাবিরোধী অপরাধ করে, তারা অপরাধী বা পাপী নাও হতে পারে, অনেক সময় তারা শুধু কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে চলা সাধারণ মানুষ, যারা নিজ দায়িত্বের বাইরে গিয়ে চিন্তা করে না, আর যা করণীয় বলে বলা হয় তা পালন করে চলে।
হান্না আরেন্ডট ছিলেন একজন ফিলোসফার ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হোলোকস্টের সময় জার্মানি থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি নাজি অপরাধী আইখম্যানের বিচার শোনার জন্য জেরুজালেমে যান এবং সেখানে বিচারকাহিনী বিশ্লেষণ করে দেখেন যে আইখম্যান জঘন্য অপরাধের মূল কারণ ছিল তার অবিবেচক আনুগত্য আর কর্তৃপক্ষের আদেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য।
আইখম্যান নিজেকে বিশেষ তৎপর বা খলনায়ক হিসেবে দেখাতো না। তিনি তার কাজকে সরকারি কাজ মনে করতেন এবং নিজের কর্মকাণ্ডের নৈতিকতা নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতেন না। এই অভিজ্ঞতা থেকে আরেন্ডট ধারণা দেন শয়তান বা অতি পাপী লোকদের বাইরে, এক ধরনের সাধারণ মানুষ থেকে বড় অন্যায় হয়।
কেন এই ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ?
আমাদের সমাজে অনেক সময় মনে হয়, বড় ধরনের অন্যায় বা অত্যাচার হয় বিশেষ কিছু অসাধারণ খলনায়কের কারণে। কিন্তু এই ধারণা বুঝিয়ে দেয় সাধারণ মানুষদের মধ্যেও এ প্রবণতা লুকিয়ে থাকতে পারে, যদি তারা নিজের নৈতিক দায়িত্ব ভুলে যায় এবং অন্ধভাবে কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে চলে।
এই তত্ত্ব আমাদের শেখায়, অত্যাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধ শুধু একক দুষ্ট চরিত্রের ফল নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণ্ডি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফল। যখন মানুষ ‘তাহা করতে হবে’ বলে শুধুমাত্র আদেশ পালন করে, তখন বৃহৎ অপরাধের পথ প্রশস্ত হয়।
মানুষের মধ্যে চিন্তাশীলতা ও নৈতিক বিচারবোধ থাকলেই বড় ধরনের অন্যায় রোধ করা সম্ভব। অন্যায়কে শুধুমাত্র আইন বা শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কারণ নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের অভাব থেকেই অপরাধ ঘটে।
১৯৬০-এর দশকে স্ট্যানলি মিল্গ্রাম নামে একজন মনোবিজ্ঞানী “কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য” পরীক্ষা করেন। তার পরীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণ মানুষও কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিপজ্জনক মাত্রার বিদ্যুৎ শক দিতে রাজি থাকে, এমনকি যখন তা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়। এই পরীক্ষা “Banality of Evil” ধারণার সঙ্গে মিলে যায়, কারণ এটি দেখায় মানুষকে দায়িত্ব ও বিচার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে তারা অসাধারণ কাজও করতে পারে।
“Banality of Evil” ধারণাকে সমালোচনাও করা হয়েছে। অনেক গবেষক বলেন, আইখম্যানের মত অপরাধীদের পাপী হিসেবেই দেখানো উচিত, কারণ তারা শুধু কর্তৃপক্ষের আদেশ পালনকারী ছিল না, বরং তাদের গভীর পরিকল্পনা ও অভিপ্রায়ও ছিল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই ধারণা অপরাধের দায়কে কমিয়ে দেয়, কারণ এটা বলে দেয় অপরাধী শুধু সরল মানুষ ছিল।
আজকের দিনে “Banality of Evil” আমাদের শেখায় নৈতিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব অবহেলা করলে সমাজে ছোট থেকে বড় অন্যায় জন্ম নিতে পারে। প্রতিটি ব্যক্তি যদি নিজের নৈতিক বিচার ও চিন্তাশীলতা বজায় রাখে, তাহলে বিশাল সামাজিক দুর্নীতি, অত্যাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে বাঁচা সম্ভব। কর্তৃপক্ষের আদেশ শুধু মেনে চলা নয়, তার পেছনে থাকা নৈতিকতা ও মানবতার বিষয়গুলো বিবেচনা করাই সত্যিকারের দায়িত্ব।
“Banality of Evil” ধারণা শুধুমাত্র ইতিহাসবিদ বা দার্শনিকদের জন্য নয়, বরং সকল মানুষের জন্য নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা বহন করে। এটি আমাদের সতর্ক করে সমাজে যদি সাধারণ মানুষ নিজের নৈতিক বিচার ও চিন্তা শক্তি হারিয়ে ফেলে, তাহলে বড় ধরনের অমানবিকতা ও অন্যায় ঘটতে পারে। আধুনিক রাজনীতি ও সংস্থার কাঠামোর মধ্যে যেখানে আদেশ ও নিয়মাবলী অনেক সময় ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নৈতিকতার ওপরে চাপ সৃষ্টি করে, সেখানে “Banality of Evil” ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নিজের বিচার ও দায়িত্ব কখনো ছাড়তে হবে না।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধের পিছনে থাকতে পারে সাধারণ মানুষের অবিচার ও চিন্তাশূন্যতা। এটি শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্যও প্রাসঙ্গিক। নৈতিকতা, বিচারবুদ্ধি ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র যদি শুদ্ধ ও নৈতিক থাকতে চায়, তাহলে এই ধারণা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।


