ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, গাজার সব ফিলিস্তিনিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের একটি শিবিরে স্থানান্তরের জন্য সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দেশটির গণমাধ্যমগুলো সোমবার (৭ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে।
কাটজ সাংবাদিকদের বলেন, রাফাহ শহরের ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’ অর্থাৎ মানবিক আশ্রয় শিবির হিসেবে একটি এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার, যেখানে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে রাখা হবে, এবং পরে গাজার পুরো ২১ লাখ জনগোষ্ঠীকে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, ভেতরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে তারা হামাসের সাথে যুক্ত নয়। একবার ভেতরে ঢুকলে তাদের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, যদি পরিস্থিতি অনুকূল হয়, তাহলে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে, সেই সময়েই শিবিরের নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।
এ পরিকল্পনাকে এক ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবী সরাসরি ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের একটি প্রক্রিয়াগত পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মানবাধিকার আইনজীবী মাইকেল স্ফার্ড ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এটি মূলত গাজা উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে জনগণকে জোরপূর্বক স্থানান্তরের মাধ্যমে তাদের উপত্যকার বাইরে বহিষ্কারের প্রস্তুতি।’
জাতিসংঘও এর আগে সতর্ক করেছে, কোনো দখলকৃত ভূখণ্ডের বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক স্থানান্তর বা বহিষ্কার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী এবং ‘জাতিগত নির্মূলের শামিল’।
কাটজের বক্তব্যের পরে সোমবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নেবে এবং সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র পুনর্বাসন করবে।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি মনে করি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূরদৃষ্টি অত্যন্ত চমৎকার। এর নামই হলো স্বাধীন ইচ্ছা। যদি কেউ থাকতে চায়, তারা থাকতে পারবে, আর যদি কেউ চলে যেতে চায়, তবে তাদের চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত…’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন দেশগুলো খুঁজে বের করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি, যারা সবসময় বলে এসেছে যে তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ দিতে চায়।’
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আশপাশের দেশগুলো থেকে দুর্দান্ত সহযোগিতা পেয়েছি, প্রত্যেকটি দেশের কাছ থেকেই দারুণ সহযোগিতা পেয়েছি। সুতরাং কিছু ভালোই হবে।’
ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, এটি তাদের জীবনে আরেকটি নাকবা নিয়ে আসতে পারে — আরবি ভাষায় যার অর্থ ‘বিপর্যয়’। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় ও তার পরের যুদ্ধে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বা জোরপূর্বক বিতাড়িত হতে বাধ্য হয়েছিল।
তাদের অনেকেই গাজায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, আর বর্তমানে তাদের বংশধররা গাজার জনসংখ্যার প্রায় ৭৫%। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯ লাখ নথিভুক্ত ফিলিস্তিনি শরণার্থী দখলকৃত পশ্চিম তীরে বাস করছে। আরও ৩৪ লাখ শরণার্থী জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননে বাস করছে।
হামাস নির্মূলের নামে ইজরাইলের গত দুই বছরের সামরিক অভিযানে গাজার অধিকাংশ মানুষকে একাধিকবার তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, গাজার ৯০% এর বেশি বাড়িঘর আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।


