সমাজ কীভাবে আমাদের ‘আমি’ গঠন করে?

“তুমি কে?”—এই সহজ প্রশ্নটির পেছনে আছে সমাজবিজ্ঞানের জটিল ও গভীর ব্যাখ্যা। একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে চেনে, নিজের অস্তিত্বকে বোঝে এবং নিজের সত্তাকে গড়ে তোলে, এই গোটা প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় ‘Self’ বা আত্ম-সত্তার গঠন। তবে এই আত্ম-সত্তা কখনোই একা দাঁড়ায় না; এটি গড়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ, পারিপার্শ্বিকতা, পরিবার, সংস্কৃতি ও ভাষার মাধ্যমে। আর এই গঠনের প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় সমাজায়ন বা Socialization।

সমাজায়ন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন মানুষ সমাজের নিয়ম-কানুন, মূল্যবোধ, ভাষা, আচরণ ও ভূমিকা শিখে নেয়। এটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। শিশুর জন্মের পর তার পরিবারই প্রথম সামাজিক শিক্ষালয়, যেখানে সে শেখে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে অন্যদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। পরবর্তীতে বন্ধু, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, ধর্ম, রাজনীতি, এমনকি পপ কালচারও সমাজায়নের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাথমিক সমাজায়ন শিশু অবস্থায় ঘটে; পরিবারই এখানে মুখ্য। গৌণ সমাজায়ন কৈশোর ও পরবর্তী সময়ে ঘটে; বিদ্যালয়, বন্ধু, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি এর উৎস।

আত্ম-সত্তা হচ্ছে সেই ধারণা যা একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে ধারণা করে। আমি কে? আমি কেমন? আমি সমাজে কী ভূমিকা পালন করি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই গড়ে তোলে একজনের Self বা আত্মপরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আত্মপরিচয় কি স্বতঃসিদ্ধ? না কি এটি সমাজের একটি নির্মাণ? সমাজবিজ্ঞানের মত অনুযায়ী, আত্ম-সত্তা প্রাকৃতিক নয়, সামাজিকভাবে নির্মিত। অর্থাৎ মানুষ জন্মগতভাবে ‘আমি’ নিয়ে জন্মায় না; বরং সে শেখে কীভাবে ‘আমি’ হতে হয়। এই ‘আমি’ বা Self গঠনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছেন Charles H. Cooley ও George Herbert Mead-এর তত্ত্ব।

চার্লস কুলি ‘Looking Glass Self’ ধারণা দেন। তার মতে আমরা নিজেদেরকে যেমন দেখি, সেটা আসলে অন্যেরা আমাদেরকে কীভাবে দেখে, সেই প্রতিফলনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। এই তত্ত্বে তিনটি ধাপ রয়েছে:
১. অন্যেরা আমাকে কীভাবে দেখে।
২. সেই দৃষ্টিভঙ্গির মূল্যায়ন।
৩. এর মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে গর্ব, লজ্জা, আত্মবিশ্বাস অথবা হীনমন্যতা। এই প্রক্রিয়াটি প্রতিদিনের জীবনে ঘটে, কখনো সচেতনভাবে, কখনো অসচেতনভাবে।

জর্জ হারবার্ট মিড আত্ম-সত্তার একটি গভীর ও দ্বৈত গঠন বিশ্লেষণ করেন, তিনি বলেন, Self গঠিত হয় ‘I’ এবং ‘Me’ এই দুই অংশে:
‘Me’: সমাজ থেকে শেখা নিয়ম, প্রত্যাশা, সামাজিক ভূমিকা। এটি সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত অংশ।
‘I’: নিজের স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন প্রতিক্রিয়া। এটি সৃজনশীল ও নতুন। এই দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ায় মানুষ নিজের সত্তাকে খুঁজে পায়। যেমন, একজন ছাত্র পরীক্ষার আগে ভাবছে, “আমাকে ভালো করতে হবে, সবাই আশা করছে” এটি ‘Me’। আবার হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলো সে নিজের মতো প্রশ্নপত্র সাজাবে—এটি ‘I’।

ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। ব্যক্তি যদি না থাকে, তাহলে সমাজের ধারণা অর্থহীন। আবার সমাজ ছাড়া ব্যক্তির আত্ম-সত্তাও গঠিত হতে পারে না। কেউ একা থাকলেও তার মধ্যে কাজ করে সমাজের নিয়ম, ভাষা, সংস্কৃতি। তাই আত্মপরিচয় ব্যক্তিগত হলেও, তা গভীরভাবে সামাজিক।

ডিজিটাল যুগে আত্ম-সত্তার ধারণা আরো জটিল হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ curated self বা সাজানো আত্মপরিচয় তৈরি করছে। একজন মানুষ হয়তো বাস্তবে লাজুক, কিন্তু অনলাইনে সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও জনপ্রিয়। এখানেই প্রশ্ন উঠে কোনটা আসল Self?

এরিক গফম্যান আত্মপরিচয়ের একটি অভিনয়গত ব্যাখ্যা দেন, যা The Presentation of Self in Everyday Life বইতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর মতে প্রতিদিন আমরা যেন একটি মঞ্চে অভিনয় করি—একেকটি সামাজিক পরিস্থিতিতে আমরা একেক রকম ভূমিকা পালন করি। এই ভূমিকার পেছনে থাকে সামাজিক প্রত্যাশা, পরিচিতি রক্ষা এবং আত্ম-উপস্থাপনার কৌশল। অর্থাৎ আত্ম-সত্তা কোনো স্থির বা একমাত্রিক সত্তা নয়; এটি পরিবর্তনশীল, পরিস্থিতিনির্ভর এবং অভিনয়ভিত্তিক। এই তত্ত্বটি আধুনিক ডিজিটাল যুগে আরও প্রাসঙ্গিক, যেখানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব হলো সেই মঞ্চ যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের পছন্দসই ‘আমি’ উপস্থাপন করি। বাস্তব জীবনে আমরা যেমন নির্ভরশীল, দ্বিধাগ্রস্ত অথবা অস্পষ্ট হতে পারি, অনলাইনে আমরা হতে পারি নিখুঁত, পরিপাটি ও জনপ্রিয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্ম-সত্তা একটি নিরবচ্ছিন্ন উপস্থাপনা, যেখানে ব্যক্তি তার সমাজ, সময় ও প্রযুক্তির আলোকে নিজের পরিচয় গঠন ও উপস্থাপন করে চলে প্রতিনিয়ত। এইভাবেই ব্যক্তি নামক এককটি হয়ে ওঠে বৃহত্তর সামাজিক বিন্যাসের এক অপরিহার্য অংশ।

আত্ম-সত্তা ও সমাজায়ন এই দুইটি বিষয় আমাদের ব্যক্তিসত্তা গঠনের মৌলিক স্তম্ভ। মানুষ জন্মগতভাবে ‘আমি’ হয়ে জন্মায় না; সে শেখে, গড়ে উঠে, ও নিজের পরিচয় নির্মাণ করে সমাজের আয়নায়। Cooley-এর আয়না, Mead-এর ‘I’ ও ‘Me’, Goffman-এর উপস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের আত্মপরিচয়কে যেভাবে নির্মাণ করে, তা বুঝতে পারলেই আমরা জানতে পারবো “আমি কে” এই প্রশ্নটি আসলে “আমরা কে” এই প্রশ্নের ছায়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন