আপনি কি কখনও এমন স্বপ্ন দেখেছেন, যেটা ঠিক আপনার ঘুমানোর আগের কথার বা কারও ভাবনার সঙ্গে মিলে গেছে? মনে হয়েছে যেন অন্য কারও চিন্তা আপনার ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড়েছে? এমন অনুভূতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ১৯৬০-এর দশকে আমেরিকার নিউ ইয়র্কের Maimonides Medical Center-এ শুরু হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী গবেষণা, Dream Telepathy Experiment। এর লক্ষ্য ছিল, ঘুমের মধ্যে একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের চিন্তা বিনিময় সম্ভব কি না অর্থাৎ, স্বপ্নে ‘টেলিপ্যাথিক’ বার্তা আদান-প্রদান সত্যিই ঘটে কি?
১৯৬০-এর দশক ছিল মনস্তত্ত্ব ও প্যারাসাইকোলজির যুগান্তকারী সময়। যুক্তরাষ্ট্রে তখন মানসিক রোগ, ঘুম, স্বপ্ন এবং মন-শরীর সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরণের গবেষণা চলছিল। এই সময়ে মনোবিজ্ঞানী Montague Ullman এবং পরে তাঁর সহকর্মী Stanley Krippner একত্রিত হন একটি অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে “মানুষ কি স্বপ্নে অন্যের মনের ভাব বুঝতে পারে?” এই প্রশ্নকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করতে তাঁরা গঠন করেন Maimonides Dream Laboratory।
গবেষণাটি ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। পদ্ধতিটি ছিল একজন “সেন্ডার” বা বার্তা-প্রেরককে একটি নির্দিষ্ট ছবি বা শিল্পকর্ম দেখতে দেওয়া হতো। আর একজন “রিসিভার” বা গ্রহণকারী অন্য একটি ঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন, তাঁকে REM (Rapid Eye Movement) ঘুমের পর্যায়ে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হতো—বিশেষ করে।
REM ঘুমের সময় গবেষকরা রিসিভারকে জাগিয়ে তুলতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন “আপনি এখন কী স্বপ্ন দেখছিলেন?” সেই স্বপ্নের বর্ণনা সংগ্রহ করে তা মিলিয়ে দেখা হতো সেন্ডার যে চিত্রটি দেখেছিলেন, তার সঙ্গে কোনো রকম সাদৃশ্য আছে কি না। এভাবে বহু রাত ধরে ডজনখানেক পরীক্ষা চলেছে।
অনেক পরীক্ষায় দেখা গেছে, রিসিভাররা এমন স্বপ্ন দেখেছেন যেগুলোর উপাদান সেন্ডারের দেখা ছবির সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে গেছে।একজন সেন্ডারকে দেওয়া হয়েছিল বিখ্যাত চিত্রশিল্পী Salvador Dali-র একটি সুররিয়াল পেইন্টিং। সেই রাতে রিসিভার স্বপ্নে দেখেন গলে যাওয়া ঘড়ি, বাঁকা আকৃতি, এবং অস্পষ্ট মুখাবয়ব। গবেষকদের মতে, এই সাদৃশ্য কেবল কাকতাল হতে পারে না। অবশ্য সব পরীক্ষায় সফলতা আসেনি। কিছু পরীক্ষায় মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি বা স্বপ্ন ছিল অসংলগ্ন। তবুও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেইমোনিদেস ল্যাবের রিসিভাররা “র্যান্ডম চয়েস” থেকে বেশি পরিমাণে সঠিক বিষয় চিনে নিতে পেরেছেন।
এই গবেষণা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুললেও মূলধারার বিজ্ঞানীরা এর বৈজ্ঞানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল পরীক্ষাগুলো ছোট পরিসরে। রিসিভারের বর্ণনা মূলত ছিল মৌখিক ও ব্যাখ্যাভিত্তিক, যার মধ্যে পর্যবেক্ষকের পক্ষপাত (observer bias) থাকতে পারে। ফলাফল পুনরায় প্রমাণযোগ্য ছিল না। এরপরেও ১৯৭০-এর দশকে একাধিক স্বতন্ত্র গবেষক এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অনুরূপ ফলাফল পেয়েছেন বলে দাবি করেন। বিশেষ করে Charles Tart ও Stanley Krippner এই বিষয়ের উপর আরও লেখালেখি ও গবেষণা করেন।
যখন বিজ্ঞানীরা আজ ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI), নিউরাল ইমপ্লান্ট, এবং ড্রিম রিকল সফটওয়্যার তৈরি করছেন, তখন প্রশ্নটা উঠে আসে একজন মানুষের চিন্তা কি ভবিষ্যতে অন্য কারও মস্তিষ্কে পাঠানো সম্ভব হবে?
২০১৯ সালে, এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ঘুমের ভেতর বাইরের শব্দ ও প্রশ্নের প্রতি সাড়া দিতে পারে। এমনকি জেগে ওঠার আগেই ‘ল্যাব পরীক্ষকদের’ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে স্বপ্নে! এধরনের ফলাফলগুলো মেইমোনিদেস এক্সপেরিমেন্টের স্বপ্ন-যোগাযোগ ধারণাকে আরও আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাষায় রূপ দিতে সাহায্য করছে।
টেলিপ্যাথি যদি একধরনের চেতনার ইন্টারফেসিং হয়, তবে সেটি নিছক কল্পনা নয়, বরং একটি প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাও হতে পারে যদি আমরা মস্তিষ্কের তরঙ্গ, ইমেজ এবং স্মৃতিকে ডিজিটাল ভাষায় রূপান্তর করতে পারি।
Maimonides ল্যাবের গবেষণাটি কেবল বিজ্ঞান নয়, একধরনের দার্শনিক অনুসন্ধানও ছিল। কেননা এটি এমন এক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, যা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে, চেতনার একাকিত্ব। যদি সত্যিই আমরা ঘুমের মধ্যে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারি, তাহলে প্রশ্ন আসে, চেতনার সীমা কোথায়? আমি যে ‘স্বপ্ন’ দেখি, তার কতটুকু আমার নিজের? অনুভব কি কেবল শরীরের ভেতর সীমাবদ্ধ, না কি তা অন্যতর কোনো জগতের দরজা? এই প্রশ্নগুলো প্যারাসাইকোলজির বাইরেও, বৌদ্ধ দর্শন, প্লেটোনিক ধারণা বা আধুনিক ‘consciousness studies’-এর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত।
আপনি কী কখনো এমন কোনো স্বপ্ন দেখেছেন যা বাস্তব কারও চিন্তা বা অনুভূতির সঙ্গে মিলে গেছে? হতে পারে, সেটাই আপনার ব্যক্তিগত ‘ড্রিম টেলিপ্যাথি’ অভিজ্ঞতা। মেইমোনিদেস ড্রিম ল্যাবের গবেষণা আমাদের শুধু স্বপ্ন নয়, চেতনার গভীরতাও বুঝতে সাহায্য করে।


