জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওমেন) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বছরজুড়ে অন্তত ৮৩ হাজার নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ হাজার নারীকে হত্যা করেছে তাদেরই ঘনিষ্ঠজন—স্বামী, প্রেমিক, প্রাক্তন সঙ্গী, বা পরিবারের সদস্য যেমন ভাই, চাচা বা মামা। আন্তর্জাতিক নারী সহিংসতা নির্মূল দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদন বলছে, প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী এবং প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী বা কন্যাশিশু পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকা কারও হাতে খুন হচ্ছেন।

জাতিসংঘের মতে, বহু বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, সচেতনতা কার্যক্রম ও নীতি সংস্কার সত্ত্বেও নারীহত্যা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং ঘর—যে স্থানকে সাধারণভাবে নিরাপত্তার আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা আজও নারীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ইউএনওডিসির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক জন ব্র্যান্ডোলিনো মন্তব্য করেন, “ঘর এখনো বহু নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। নারীহত্যা রোধে প্রতিরোধ কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া জরুরি।”

বিশ্বের ১১৭টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আফ্রিকায় নারীহত্যার হার সবচেয়ে বেশি, প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু ওই অঞ্চলেই বছরজুড়ে প্রায় ২২ হাজার নারী খুন হয়েছেন। এশিয়ায় খুন হয়েছেন ১৭ হাজার ৪০০ নারী, আমেরিকায় ৭ হাজার ৭০০, ইউরোপে ২ হাজার ১০০ এবং ওশেনিয়ায় ৩০০ নারী।

প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ হত্যাকাণ্ড ঘটে তার মাত্র ২০ শতাংশ নারী হলেও পরিবারের ভেতরে সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ঘনিষ্ঠজনের হাতে ২০২৪ সালে নিহত নারীদের হার ৬০ শতাংশ, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১১ শতাংশ।

প্রতিবেদনে উদ্বেগজনকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রযুক্তিগত সহিংসতার বিষয়টি। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করার কথা, সেখানে কিছু ক্ষেত্রে তা নতুন ধরনের সহিংসতার দরজা খুলে দিয়েছে। অনিচ্ছাকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, ডিপফেক তৈরি, সাইবার স্টকিং ও অনলাইন হুমকি এসব ডিজিটাল সহিংসতা বাস্তব জীবনে শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার দিকে ধাবিত হতে পারে। জাতিসংঘের নারী নীতি বিভাগের পরিচালক সারাহ হেন্ড্রিক্স বলেন, “নারীহত্যা কখনোই একদিনে ঘটে না। এটি সাধারণত অনলাইন–অফলাইনে ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি ও হয়রানির ফল।”

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ছয় দফা উদ্যোগের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে রয়েছে—শক্তিশালী আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য কার্যকর সহায়ক সেবা নিশ্চিত করা, অপরাধ তদন্ত ও বিচারব্যবস্থায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মানোন্নয়ন এবং সর্বস্তরের সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

জাতিসংঘ বলছে, ফেমিসাইড কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকট। তাই রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সবার সম্মিলিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ ছাড়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সূত্র- দ্য ডেইলি স্টার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

২০২৪ সালে বিশ্বে কয়লার ব্যবহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বিপদে ফেলছে। বিশ্ব রিসোর্স ইনস্টিটিউটের (WRI) বার্ষিক "স্টেট অব ক্লাইমেট অ্যাকশন"...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন