বাংলাদেশে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের ক্লাবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে কী বার্তা দিলেন, এ নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ আলোচনা। রাজনৈতিক দলগুলোর কাদা ছোড়াছুড়ি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার বিষয় এবং এমনকি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সতর্ক করেছেন তিনি।
জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের এই বক্তব্য দেওয়ার সময় তার শারীরিক ভঙ্গি এবং বক্তব্যের ভাষাও বেশ কঠোর মনে হয়েছে। রাজনীতিকদেরও কেউ কেউ এতে অবাক হয়েছেন। এখন সেনাপ্রধানের এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা একটা বড় কারণ বলে রাজনীতিকদেরই অনেকে মনে করেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বংলাকে বলেছেন- রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, সে কারণে সেনাপ্রধানকে সবাইকে সতর্ক করে বক্তব্য দিতে হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মির্জা ফখরুল আরো বলেন, সেনাপ্রধানের বক্তব্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই। এই বক্তব্য তার ভালই লেগেছে। কারণ দেশে এখন সবার ঐক্য প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বিবিসি বাংলাকে বলেন- রাজনীতিতে ঐক্যের জায়গায় বিভক্তির কারণে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটাই সেনাপ্রধানের বক্তব্যে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করা উচিত।
মতিউর রহমান আকন্দ অবশ্য বলেছেন – দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সঙ্গে স্বাধীনতা – সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার বিষয় কেন এলো, এটি সহ সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সার্বিক বিষয় নিয়ে তারা দলে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন।
অন্যান্য দল ও জোটগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা নিজেদের
মধ্যে আলোচনার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। সবদিকে যখন বিশৃঙ্খলা এ সরকার সামলাতে পারছে না, সামরিক শাসন আসতে পারে কি না – এখন এই আলোচনাও উঠছে বিভিন্ন মহলে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান বললেন, তার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। তিনি নির্বাচনের কথা বলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, দেশে অস্থির পরিস্থিতিতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে সেনাপ্রধানের বক্তব্য।
আওয়ামী লীগের শাসনের সময় গুম, খুনসহ মানবাধিকার লংঘনের বিভিন্ন অপরাধের ব্যাপারে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই-এর অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ এসেছে। এমনকি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান রাখা উচিত কি না – এই প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন। আর এমন পটভূমিতেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই- কে ‘আন্ডারমাইন না করা’র ব্যাপারে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে তার একটা অবস্থান এসেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে ১৬ বছর আগের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আবার তদন্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে ওই ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকা সাবেক বিডিআর সদস্যদের অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভতৈরি হয়েছে। সেই চাপ থেকে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে বিষয়টি এসেছে – দুইজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন।
সেনাপ্রধান তার সর্বশেষ বক্তব্যে ডিসেম্বর বা কাছাকাছি সময়ের মধ্যে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথাও বলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সেনাপ্রধানের বক্তব্য নির্বাচনের ব্যাপারে তাগিদ বাড়াবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেশকে নির্বাচনমুখী করা হলে সমস্যা কমে আসবে।


