প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতা ছিল পৃথিবীর প্রথম উন্নত নগরসভ্যতাগুলোর একটি, যা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৪৫০০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) ভূমিতে বিরাজমান ছিল। সুমেরীয়রা শুধু নগরায়ণ এবং কৃষি ব্যবস্থা নয়, তাদের ধর্মীয় ও মিথোলজিক্যাল ধারনাগুলোও অত্যন্ত জটিল এবং গূঢ় ছিল। সুমেরীয় ধর্মে দেবতাদের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। তাদের দেবতাদের মধ্যে ‘আনু’ ও ‘এনকি’ ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাদের গোপন সভা বা সমাবেশ নিয়ে এক ধরনের রহস্য ও ধারণা বর্তমান রয়েছে, যেখানে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা গৃহীত হত বলে বিশ্বাস করা হয়।
‘আনু’ হলেন সুমেরীয় প্যানথিওনের সর্বোচ্চ আকাশের দেবতা, যাকে আকাশের রাজা হিসেবে বিবেচনা করা হত। তিনি ঈশ্বরদের রাজত্বের শীর্ষে অবস্থান করতেন এবং অন্যান্য দেবতাদের উপর উচ্চ কর্তৃত্ব পালন করতেন। আনু শব্দের অর্থ “আকাশ” বা “আকাশের দেবতা” এবং তাকে সৃষ্টির এক প্রাথমিক সত্তা মনে করা হত।
অন্যদিকে ‘এনকি’ বা ‘এয়া’ ছিলেন মাটির, জলের এবং বুদ্ধিমত্তার দেবতা। তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকারী এবং রক্ষাকর্তা দেবতা হিসেবেও পরিচিত। এনকির ক্ষমতা ছিল জ্ঞানের, যাদুর এবং সৃষ্টি শক্তির সমাহার। তিনি মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল দেবতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের উন্নতি ও রক্ষা করতেন।
সুমেরীয় ধর্মগ্রন্থ ও মিথোলজিতে ‘ইগিগি’ ও ‘অনুন্নাকি’ নামক দুটি দেবতাদের গ্রুপের কথা উল্লেখ আছে। ‘অনুন্নাকি’ হলেন উচ্চ মর্যাদার দেবতারা, যারা আনুর অধীনস্থ। তাদের সভা বা গোপন সমাবেশকে মিথোলজিক্যাল সাহিত্যে ‘দেবতাদের পর্ষদ’ বা ‘দেবতাদের জুরির কক্ষ’ বলা হয়েছে। বিশেষ করে ‘এনকি’ ও ‘আনু’ এই গোপন সভার কেন্দ্রবিন্দু। এই সভায় পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ, মানবজাতির ভাগ্য নির্ধারণ, এবং প্রকৃতির গতি-প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা হত বলে ধারণা। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সমগ্র জগতের নিয়মাবলী ও বাস্তবতাকে প্রভাবিত করত।
সুমেরীয় পুরাতত্ত্ব ও গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এই গোপন সভায় যে পরিকল্পনা হত তা শুধুমাত্র দেবতাদের নয়, পুরো ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলত। সভার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা যেমন বন্যা, কৃষি, রাজতন্ত্র, যুদ্ধ-শান্তি ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হত।
‘এনকি’ তার জ্ঞান ও কৌশল দিয়ে সভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন, বিশেষত মানবজাতির কল্যাণ ও রক্ষার জন্য। তাঁকে মানবের পক্ষে দেবতাদের সাথে আলোচনা চালানোর মধ্যমণি হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে ‘আনু’ ছিলেন সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ, যিনি সভার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতেন।
সুমেরীয় মিথে এই সভার কথা প্রায়ই ‘এনলিলের কোর্ট’ বা ‘আনু-এর মহাসভা’ নামে উল্লেখ আছে। বিশেষ করে ‘এনকির বর্ণনা’ ও ‘এনমার্কার স্মৃতি’ শিলালিপি ও কাদম্যাথিক টেক্সটগুলোতে এই সভার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বৈজ্ঞানিক গবেষকরা প্রাচীন সুমেরীয় ভাষার ট্যাবলেট থেকে উদ্ঘাটিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এই সভার অন্তর্গত সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রণা শুধুমাত্র ধর্মীয় ছিল না, রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যেম হিসেবেও ব্যবহৃত হত। এর মাধ্যমে সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জনগণের উপর দেবতাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
সুমেরীয় সভার গোপনীয়তা আজও অনেক রহস্যময়। কিছু গবেষক মনে করেন, এই সভা শুধুমাত্র মিথ নয়, বরং প্রাচীন মানব সভ্যতার সুশাসন ও প্রশাসনের প্রতীক। অন্যদিকে আধুনিক প্যারানরমাল ও এজোটারিক তত্ত্বের অনুসারীরা এই সভাকে একটি আলৌকিক ও মহাজাগতিক শক্তির মিটিং হিসেবে দেখেন।


