সিরিয়ায় গত কয়েকদিনে নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর সাথে আসাদপন্থী সেনাদের সংঘাতে বেসামরিক নাগরিক সহ ১৩০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা এটি। সাম্প্রতিক এই সংঘাতের শুরু হয় বৃহস্পতিবার। সিরিয়ার পশ্চিম উপকূলের শহর লাটাকিয়া ও জাবলেহ’তে নিরাপত্তা রক্ষীদের ঘাঁটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সমর্থক সেনারা হামলা করে, যাতে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর অনেক সদস্য মারা যান। এই হামলার জবাবে শুক্রবার ও শনিবার সিরিয়ার নিরাপত্তা রক্ষীরা সিরিয়ার পশ্চিম উপকূলের লাটাকিয়া, জাবলেহ ও বানিয়াস শহরে আসাদ সমর্থক সেনাদের ওপর হামলা চালায়। নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর সাথে হামলায় যোগ দেয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরাও।
সেসব হামলায় ঐ অঞ্চলে বসবাসরত সংখ্যালঘু আলাওয়াইত সম্প্রদায়ের বহু বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন বলে জানাচ্ছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস। সংস্থাটি বলছে গত কয়েকদিনের ‘গণহত্যা’য় অন্তত ৮৩০ জন বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন। অন্যদিকে দুই পক্ষের সংঘাতে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ২৩১ জন আর আসাদ সমর্থক ২৫০ জন মারা গেছেন। তাদের হিসেব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৩১১ জন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি বিবৃতিতে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে মানুষ হত্যা করার জন্য বিদেশি জিহাদি সহ উগ্র ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিন্দা জানায়। “
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র খ্রিস্টান, দ্রুজ, আলাউয়ি এবং কুর্দি সম্প্রদায় সহ রয়েছে সিরিয়ার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের পাশে আছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছে।” তিনি আরও বলেন, “সিরিয়ার অন্তর্বতীকালীন সরকারকে সিরিয়ার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এসব গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি করতে হবে।” আসাদ সমর্থক সেনাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার নিরাপত্তা রক্ষীরা অভিযান চালানোর সময় সেখানে সংখ্যালঘু আলাওয়াইত গোষ্ঠীর নাগরিকদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালানো হয়। বাশার আল-আসাদ আলাউয়ি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য।
ভুক্তভোগীদের অনেকে বলছেন তাদের ওপর বিদেশি বিদ্রোহী যোদ্ধারা হামলা চালিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট চালায়। নিহত বেসামরিকদের মধ্যে সংখ্যালঘু আলাউইত সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুরাও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সহিংসতার যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে সেগুলোর একটিতে বলা হয়েছে, এক গ্রামে বহু আলাউইতি পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এতে সিরিয়ার ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি কর্তৃপক্ষ অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন চালানোর সক্ষমতা রাখে কি না, তা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। সিরিয়ার নতুন নেতা ও প্রেসিডেন্ট আহমেদ আহমেদ আল-শারার সরকারের দাবি, তারা আসাদপন্থি বাহিনীর আক্রমণের জবাব দিচ্ছে। পাশাপাশি সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দেখছে।
সিরিয়ার কর্মকর্তারা অভিযান চলাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করেছেন। তবে এসব ঘটনার জন্য তারা সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসা অসংগঠিত বেসামরিক জনতা ও যোদ্ধাদের দায়ী করেছেন। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস আরও জানিয়েছে, গত শুক্রবার (৭ মার্চ) সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী লাতাকিয়া প্রদেশে আলাউয়ি সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ১৬২ জনকে প্রকাশ্য ময়দানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। শুধু হত্যাই নয়, আলাউয়িদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, যার ফলে এই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ নিকটবর্তী পাহাড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
গ্রামের পাশাপাশি আলাউয়ি প্রধান শহরগুলোতেও নৃশংস হামলা চালছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি বানিয়াস। বাসিন্দারা রাস্তায়, বাড়ির আঙিনায় ও ছাদে পরিত্যক্ত অবস্থায় অগণিত লাশ দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। ৫৭ বছর বয়সি আলী শেহার ভাষ্য, ‘বন্দুকধারীরা লোকজনের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালাচ্ছিল, হত্যা করার আগে কোন সম্প্রদায়ের তা পরীক্ষা করার জন্য পরিচয়পত্র চাইছিল।’


