“… সংস্কারের ক্ষেত্রে বিএনপি চাইছে নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে। এর কারণ, সম্ভবত বিএনপি মনে করছে তারাই ক্ষমতায় যাবে। আর প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর লক্ষ্য যেহেতু ক্ষমতাসীন দলকে কঠোর চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের মধ্যে রাখা, তাই সেটা বিএনপি পছন্দ করছে না। আমার ধারণা, তারা আগের শাসনপদ্ধতির গুণগত কোনো পরিবর্তন চাইছে না। অথচ আগের এই কাঠামো পরিবর্তনই এবারের গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট (চেতনা) ছিল।
… বাংলাদেশে যিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তিনি অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী। ফলে তাঁর ক্ষমতা কমানো এবং এই ক্ষমতার মধ্যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স তৈরি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ তাঁরা করেছেন।…সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারীব্যবস্থা কায়েম করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু শুধু এগুলোর মাধ্যমে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সরকার সংস্কারের বিষয়টি যেমন এজেন্ডায় নেই, একইভাবে নারী, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো বিষয়গুলোও গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত অধিকার এবং জবাবদিহির বিষয়গুলোকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ বলে মনে করা হচ্ছে না। কারখানার ভেতরে-বাইরে শ্রমিকদের যেসব অধিকার রয়েছে, আমাদের এলিটরা সেটাকে গণতন্ত্রের অংশ বলে মনে করেন না। কিন্তু এগুলোই হলো প্রকৃত গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অপরিহার্য উপাদান।
… নাগরিকদের নিজস্ব সংগঠন তৈরি করতে হবে। যেমন ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, নারী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সংগঠন তৈরি করতে হবে। এরপর তাঁদের প্রতিনিধিদের পাঠাতে হবে সংসদের উচ্চকক্ষে। তাহলেই শুধু ‘নির্বাচনী’ গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করা সম্ভব। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক পরিষদ তৈরি করতে হবে। এগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা দিতে হবে। এগুলো আবার জাতীয় পর্যায়ের কমিশনের অধীনে জবাবদিহির আওতায় থাকবে। তাহলে জাতীয় ও স্থানীয়—দুই ক্ষেত্রেই চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নিশ্চিত করা যাবে।
… রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে পুলিশের। তাই এবারও তারা স্বাধীন কমিশন চেয়েছে।…সবচেয়ে বেশি দরকার, ‘রেজিম’ পুলিশের পরিবর্তে ‘গণতান্ত্রিক’ পুলিশ তৈরি করা এবং থানা পর্যায়ে পুলিশের সংস্কার করা।…থানা পর্যায়ে নাগরিক কমিটি গঠন করে পুলিশের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স করা ছাড়া ‘গণতান্ত্রিক’ পুলিশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
… সাধারণ মানুষ পুরোনো রাজনীতি দেখতে চায় না। তাদের কথা হলো, আমরা চাই না আবার স্বৈরাচার কায়েম হোক কিংবা রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করুক। সবাই চায় এবার কিছু ‘একটা’ হওয়া উচিত। সেই কিছু ‘একটা’র প্রতিফলন আমরা সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদনে দেখতে পাচ্ছি। আমরা চাই, সব রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংস্কার নিয়ে তাদের পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা। সেসব বিবেচনা করেই মানুষ তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।
… উগ্রপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে সরকারের ঘাটতি আছে, সক্ষমতার অভাব আছে এবং সেগুলো নিয়ে সমালোচনা করাও জরুরি। কিন্তু সরকার এগুলো উসকে দিচ্ছে, বিষয়টা এমন নয়। সরকার নিজেই উগ্রপন্থীদের পক্ষে—এমন প্রচারণার ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ, ভারতীয় গণমাধ্যমকে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের এসব বিষয় নিয়ে নানা রকম ভুল প্রচারণা চালিয়েছে। এ রাজনীতিটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।”


