১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) দেওয়া মৃত্যুদণ্ড খারিজ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে গত সপ্তাহে খালাস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আদালত তাঁর সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছেন, ‘বিচারিক প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে, যার ফলে গভীর অন্যায় ঘটেছে।’
এই রায় আজহারুল ইসলামের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নে যেমন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর শুরু থেকে বিচার কার্যক্রমের নিবিড় পর্যবেক্ষক ছিলেন বার্গম্যান। তখন তিনি আদালত, প্রসিকিউশনের তদন্ত প্রক্রিয়া ও আসামিপক্ষের কৌঁসুলিদের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অসংগতি ও রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ করেছেন। সেই সব তথ্য তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের রোষের মুখোমুখি হন বার্গম্যান।
তিনি মনে করেন, ওই সময় যুদ্ধাপরাধের মামলায় যাঁরা দণ্ডিত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ থাকলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার যথাযথ না থাকার কারণে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ঠিক একইভাবে ৫ আগস্টের পর মানতাবিরোধী অপরাধের বিচার যেভাবে হচ্ছে, সেটাও যথাযথ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
ফেসবুক পোস্টে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, ‘আজহারুল ইসলামের মামলার রায়ে যে ধরনের অসংগতি ও ন্যায়বিচারের অভাব ছিল, তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজহারুল ইসলামের খালাসের রায় নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে—তাঁদের নেতৃত্ব ও সদস্যরা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত নন—বলে যে দাবি করা হয়েছে, তার পক্ষে শক্ত ভিত্তি নেই।
আপিলের রায়ের অর্থ শুধু এটিই যে আজহারুল ইসলামের বিচার সঠিকভাবে হয়নি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে মুক্ত। জামায়াতের বর্তমান প্রচারণা শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা, যা ভ্রান্ত। এটি রাজনৈতিক কৌশল, যা আসলে ইতিহাস ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের বিরুদ্ধে।’
ফেসবুকে বার্গম্যান লিখেছেন, ‘আপিল বিভাগে (আজহারুলের মামলায়) ট্রাইব্যুনালের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করা বর্তমান নতুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউশন দলের ভূমিকা সমস্যাজনক। আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আগে আজহারুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী (ডিফেন্স লইয়ার) হিসেবে ছিলেন। আপিলে তিনি নিজে ট্রাইব্যুনালের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব না করলেও তাঁর বর্তমান প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা ট্রাইব্যুনালের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটা হতেই পারে যে আপিল বিভাগে যে-ই ট্রাইব্যুনালের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করুক না কেন, আদেশ একই হতো। তবু যা ঘটেছে, তাতে স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) বিদ্যমান।’
বার্গম্যান আরও লিখেন, ‘অতীতে ট্রাইব্যুনালে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত, তাঁদের খালাসের বিষয়ে তাজুল ইসলামের স্বার্থ থাকার বিষয়টি বোধগম্য। যাঁদের তিনি অতীতে সরাসরি আইনি সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। সেই প্রেক্ষাপটে, তাঁর টিমের সদস্যদের (যাঁদের মধ্যে অন্তত একজন আগে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী দলের অংশ ছিলেন) এসব আপিলে ট্রাইব্যুনালের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নিয়োগ দেওয়াটা সঠিক হতে পারে না।’
এ বিষয়ে করণীয় হিসেবে নিজের ভাষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের পক্ষে তাজুল ইসলাম ও তাঁর প্রসিকিউশন দলের একাধিক সদস্য অতীতে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করার কারণে যদি ওই সব মামলা ভবিষ্যতে আপিল বিভাগে ওঠে, তবে ট্রাইব্যুনালের পক্ষে সেসব আপিলে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য স্বাধীন ও বাইরের আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়াই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য এবং যুক্তিসংগত হবে।’


