সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব ন্যায়ানুগ করা কেন জরুরি : আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক

… অনেকে বলেন, এখানে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বলে পৃথক বর্গ নেই। সবাই আমরা ‘বাংলাদেশি’। রাজনৈতিক উচ্চাশা হিসেবে এটা বেশ ভালো শোনায়। এ রকমই হওয়া দরকার।

কিন্তু অমুসলিম ও অবাঙালি বাংলাদেশিরা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বর্গ হিসেবে পৃথক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা নিয়েই জীবন যাপন করে। সংখ্যাগুরুরা যদিও মনে করে ‘সংখ্যালঘু’ বলে কিছু নেই, কিন্তু সংখ্যালঘু মনে করছে, তার পৃথক সত্তা সে চাইলেও মুছতে পারছে না।

… ‘দ্বিতীয় রিপাবলিকে’ খোদ সংবিধান বদল ও গণপরিষদ নিয়ে কথা হচ্ছে এখন। এ রকম পরিবেশে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতিগত বদল নিয়েও আলাপ হতে পারে কি না, সে নিয়ে ভাবা দরকার।

এমনও হতে পারে, এখনকার ব্যবস্থাতেই লোকগণনার হিসাব অনুযায়ী কিছু আসন সংখ্যালঘুদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায়। ভারতীয় লোকসভায় যেভাবে শিডিউল কাস্ট ও শিডিউল ট্রাইবদের জন্য আসন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

… সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে কোনো ধরনের সংস্কার যদি করা না হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে, সেটা বর্তমান সামাজিক বিবেচনায় অনুমান-অযোগ্য নয়। বড় দলগুলো নির্বাচনে সংখ্যাগুরুদের ভোট নিশ্চিত রাখতে সংখ্যালঘুদের প্রত্যাশিত সংখ্যায় মনোনয়ন দিয়ে বিজয়ী করে আনায় বেশি আগ্রহ দেখাবে না। অতীতে এমনও ঘটেছে, ভোটার হিসেবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এমন আসনেও প্রায়ই মুসলমান প্রার্থীরা দলগুলোর মনোনয়ন পেয়েছেন।

আবার দেশের বেশির ভাগ আসনে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা এমন নয় যে বর্তমান ভোটব্যবস্থায় কেবল নিজেদের ভোটে তাঁদের কেউ জিতে আসতে পারেন। খুলনা ও গোপালগঞ্জে মাত্র দুটি আসন আছে, যেখানে অমুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার। এর বাইরে ১০টার মতো আসনে তাঁরা বড় সংখ্যায় আছেন।

এর বাইরে সংখ্যালঘুরা কার্যত অল্প অল্প করে ছড়িয়ে আছে দেশজুড়ে। যেমন বাংলাদেশে পাঁচ লাখের মতো খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী আছে।…বৌদ্ধদের সংখ্যা দেশে খ্রিষ্টানদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান মিলে ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯ ভাগ। সংসদ যদি হয় ৩৫০ আসনের, তাহলে ৩১ থেকে ৩২ জন সংখ্যালঘু এমপি সেখানে ওই সম্প্রদায়ের থাকতে পারেন। বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা জানায়, সংখ্যালঘুরা এ রকম সংখ্যায় সংসদে ছিলেন না। ২০-এর নিচে থাকছে তাঁদের আসন।

এটাও সত্য যে ভোটের আয়োজন ধর্মের ভিত্তিতে হয় না। ভোট হয় নাগরিকতার জায়গা থেকে। রাজনৈতিক দলগুলো সেভাবেই প্রার্থী দেয়। এটাও আশা করা হয়, ভোটাররা কেবল দলগুলোর ইশতেহার দেখে ভোট দেবেন এবং বিজয়ী প্রার্থীরা ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করবেন।

কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে যৌক্তিক এসব প্রত্যাশার অনেক ব্যবধান ঘটে বলে সংখ্যালঘুদের দাবি। তারা মনে করে, বর্তমান ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সংগঠকদের কম প্রার্থী করে সংখ্যাগুরুর পছন্দ-অপছন্দের বিবেচনা মাথায় রেখেই।

এটা আশপাশের দেশগুলোরও বাস্তবতা। মিয়ানমারে অং সান সু চির দল ২০২১ সালে কোনো মুসলিম প্রার্থী রাখেনি নির্বাচনে। একই কারণে ভারতীয় লোকসভায় বিজেপির কোনো মুসলিম এমপি নেই। মিয়ানমার ও ভারতে এভাবেই বামার ও হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যাগুরুদের মন জুগিয়ে ভোটে জিতেছিল। সেসব দেশে সংখ্যালঘুদের আহাজারির কথা আমরা জানি। বাংলাদেশে আমরা সে রকম চাইব না নিশ্চয়ই, অন্তত রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নতুন উদ্যমের সময়।

কিন্তু সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব সন্তোষজনক মাত্রায় বাড়াতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পথ কী? সংখ্যালঘুরা বলছে, বাংলাদেশে তাদের নিজ প্রতিনিধি বাছাই করতে দেওয়া যেতে পারে। জনসংখ্যার হিস্যায় তারা যে পরিমাণ আসন পায়, সেসবে নিজেরা নিজেদের প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ পেলে ভালো হয়। এর মধ্যে কিছু আসন (জনসংখ্যার হিস্যা অনুযায়ী) দলিতদের জন্যও চিহ্নিত করে দেওয়া যায়।

… এ রকম সংস্কার ফলপ্রসূ হলে সংসদে সব ধরনের সংখ্যালঘুর প্রত্যাশামতো প্রতিনিধি থাকবে। তাঁরা নিজ জনগোষ্ঠীর আশা-প্রত্যাশার কথা বলতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী সরকার পদক্ষেপ নিতে পারবে বলে জানাচ্ছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তরুণেরা, যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে এবং আন্তসাম্প্রদায়িক পরিবেশকে উন্নত করবে।

এটা সংখ্যালঘুদের বিষয়ে দেশ-বিদেশের তৃতীয় পক্ষের প্রচার-প্রচারণা বন্ধেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সমাজে নতুন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দলেরও জন্ম হতে পারে এ রকম সংস্কারে। তাতে বিশেষ কোনো দলের সমর্থক বনে থাকার সিলমোহর থেকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান বা সাঁওতাল-হাজং-খাসিরা নিজেদের সরিয়ে আনতে পারবে। …”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন