“… বাংলাদেশের মানুষদের ভোেট দেওয়ার যে প্রবণতা, তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মধ্যপন্থী দলগুলোকেই সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে এই মধ্যপন্থা গ্রহণের পেছনে নগদ লাভ-ক্ষতির সহজ হিসাবটাই কাজ করে। কেননা, এখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের কোনো সেবা পেতে হলেও তাঁদের রাজনৈতিক নেতাদের শরণাপন্ন হয়ে সেটা পেতে হয়। ২০০৮ থেকে ২০২৫, মাঝখানে ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সমাজে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। সমাজে অনেকখানি মেরুকরণ ঘটে গেছে। এর পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন আছে, আবার অভ্যন্তরীণ কারণও আছে। মার্কিনদের ওয়ার অ্যান্ড টেররের অভিঘাত এবং আওয়ামী লীগের তীব্র দমনমূলক স্বৈরশাসন বাংলাদেশের সমাজ কিছুটা দক্ষিণ দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বিশেষ করে নাগরিক ও শহুরে তরুণদের একটা অংশের মাঝে সেটা প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
কিন্তু এই ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মানে ভোটের সবটাই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দিকে যাবে, তা নয়। কেননা, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক প্রতিটি দলের আলাদা আইডিওলজি আছে। অনড় কাঠামোর জন্য তাদের ভোটার ভিত্তিও সুনির্দিষ্ট। মতাদর্শিক ভিন্নতা ও বিরোধের কারণেই ডানপন্থী ভোটগুলো এক প্ল্যাটফর্মে আসা সম্ভব নয়। আবার এককভাবে নির্বাচন করে আসন পাওয়া কঠিন হওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইসলামি দলগুলো বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করতে দেখেছি। আমরা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্পেকট্রামের দিকে তাকাই, তাহলে বিএনপি ডান দিকে ঝুঁকে থাকা মধ্যপন্থী দল। আরও ডানে আছে জামায়াতে ইসলামী। আরও ডানে হেফাজতে ইসলামসহ অন্য দলগুলো। আওয়ামী লীগ কিছু বামে ঘেঁষা মধ্যপন্থী দল। আরও বামে আছে কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী নামে পরিচিত দলগুলো। ভোটের সমীকরণে সব সময়ই মধ্যপন্থী দলগুলোই আধিপত্য করে। সিংহভাগ ভোটার এ ধারার দলগুলোর, প্রতিই আকৃষ্ট হন।
… জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মধ্যপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বললেও এখন পর্যন্ত দলটি নিজেদের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি দিতে পারেনি। মধ্যপন্থী রাজনীতি যে একটা মতাদর্শ, সেই অবস্থান তাদের কথা ও কাজে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ব্যক্তির অধিকার, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, সুযোগের ক্ষেত্রে সাম্য-এ রকম মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়েই মধ্যপন্থী রাজনীতির ভিত গড়ে ওঠে। ডানপন্থীর সঙ্গে কিছু বামপন্থী লোককে ভেড়ানো মানেই মধ্যপন্থী রাজনীতি নয়।
… পুরোনো যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, সেখানে দল মানে এক ব্যক্তি। সরকার মানেই এক ব্যক্তির শাসন। কে নেতা হবেন, কে এমপি হবেন, কে মন্ত্রী হবেন, সবটাই নির্ধারণ করে দেন দলের নেতা। ফলে রাজনীতি, সরকার-সবখানেই ব্যক্তিপূজা প্রতিষ্ঠা পায়। রাজনীতির এই ব্যক্তিপূজা শেষ পর্যন্ত অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও কর্মসূচি থাকলেও সেটা কাগুজে বিষয়।
পুরোনো রাজনৈতিক চর্চাকে পেছনে ফেলে আমরা কতটা সামনে এগোতে পারব, সেটার অনেকখানিই নির্ভর করে নতুন রাজনৈতিক দলগুলো কতটা ভিন্নভাবে রাজনীতি করতে পারছে। নারী, শ্রমিক, কৃষক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রশ্নে তারা কতটা উদারভাবে দাঁড়াতে পারছে। নতুন রাজনৈতিক দল কোথা থেকে অর্থ পাচ্ছে, নেতারা কেমন জীবন যাপন করছেন, কোন্ কোন্ প্রশ্নে তাঁরা বিবৃতি দিচ্ছেন, কোন্কোন্ ইস্যুতে তাঁরা নিশ্চুপ থাকছেন-এ সবকিছুই কিন্তু মানুষ গভীরভাবে দেখছে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের থাকা না-থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। আবার বিকল্প দল না থাকায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে বাধ্য হন-এমন লিবারেল ও সেক্যুলার ভোটাররাও আছেন। আমরা ধরে নিই যে, আওয়ামী লীগ না থাকলে তাদের কট্টর সমর্থকেরা ভোেট দিতে যাবেন না। এর বাইরেও বিরাট অংশের ভোটারের ভোট দেওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক দল নেই।
… পুরোনো ঘরানার বামপন্থী দলগুলো শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের সাংগঠনিক ভিত্তিও নড়বড়ে ।ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকার প্রশ্নে পুরোনো বামপন্থীদের অবস্থান অনড় ও সেকেলে। সে কারণে যারা লিবারেল ও গণতান্ত্রিক, তাদের বামপন্থী দলগুলো আকৃষ্ট করতে পারে না। পরিবারতন্ত্র, জনতুষ্টিবাদ, সাংস্কৃতিক ক্যাচাল ও চরমপন্থী মতাদর্শের বাইরে ব্যক্তির অধিকার, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, সুযোগের ক্ষেত্রে সাম্য, নারী-কৃষক-শ্রমিক্সংখ্যালঘুর অধিকারকে জোরালোভাবে সমর্থন দেয়, এমন রাজনীতির শূন্যতা বাংলাদেশে অনেক দিনের। সেই শূন্যতা পূরণ করবে কোন্ দল?”


