বাংলাদেশে যৌন কর্মীরা সমাজের সেই অংশ যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গৃহীত না-হওয়া বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত। তাদের পেশা অবৈধ নয়, আদালতের রায়ে যৌনকর্ম বৈধতা পেলেও, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোয় তারা আজও অবহেলিত, অনানুষ্ঠানিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে রয়ে গেছেন। তাদের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে নেই কোনো কাঠামোগত সমর্থন। একই অবস্থা গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রেও, যারা দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে অসংখ্য পরিবারে শ্রম দিচ্ছেন, কিন্তু শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পান না। এই পরিপ্রেক্ষিতে যৌন কর্মীদের শ্রমিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিটি কেবল মানবিক বা নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে আনুমানিক ১ লাখের বেশি নারী ও শিশু যৌন পেশার সাথে যুক্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এদের অনেকেই প্রবল দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, মানবপাচার কিংবা বাল্যবিবাহ থেকে পালিয়ে এসে এই পেশায় জড়াতে বাধ্য হয়েছেন। এই পেশাকে ঘিরে রয়েছে গভীর সামাজিক ঘৃণা, যা তাদের স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, শিক্ষা বা পুনর্বাসনের কোনো বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে দেয় না। যৌন কর্মীদের জন্য আইনত কিছু সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে পুলিশের হয়রানি, দালাল চক্রের দখলদারি, এবং সামাজিকভাবে নিপীড়নের কারণেই তারা মূলত আইনের বাইরে, নিরাপত্তাহীন একটি জগতে বাস করেন।
যৌন কর্মীদের মতোই গৃহকর্মীরাও মূলত নারী, দরিদ্র এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসী—অর্থাৎ গ্রাম থেকে শহরে জীবিকা খুঁজতে আসা মানুষ। তারা দৈনিক ৮-১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও কোনো লিখিত চুক্তি, ছুটি বা ন্যূনতম মজুরি পান না। তাদের অনেকেই নির্যাতনের শিকার হন এবং বেশিরভাগ সময়ই বিচার পান না। তবে গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে সমাজে কিছুটা হলেও সহানুভূতি তৈরি হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপে বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা অনুমোদন করেছে। যদিও এটি এখনও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, তথাপি এটি একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, যা যৌন কর্মীদের এখনো অধরা।
কেন যৌন কর্মীদের শ্রমিক স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি?
শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার অর্থই হলো তাদের অধিকার, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অস্বীকার করা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর ২০০৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, যৌনকর্মীদের শ্রমের আওতায় না আনা হলে তারা নানা ধরণের সহিংসতা ও শোষণের শিকার হন। যৌনকর্মীদের শ্রমিক স্বীকৃতি দিলে তারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আসবেন, STI এবং HIV প্রতিরোধ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন এবং স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক বাঁধা অনেকটা দূর হবে। বৈধতা ও স্বীকৃতির মাধ্যমে যৌন কর্মীরা ব্যাংকিং সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ পেতে পারেন। এতে দালাল নির্ভরতা কমবে এবং আত্মনির্ভরতা বাড়বে।
শ্রমিক স্বীকৃতি ও সংগঠন করার অধিকার থাকলে যৌন কর্মীরাই শিশু যৌনপেশা ও পাচার রোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। ভারতের “দুরবার মহিলা সমিতি” তার বাস্তব উদাহরণ। সমাজে অনেকেই মনে করেন, যৌন পেশা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই এর স্বীকৃতি দিলে নৈতিকতা নষ্ট হবে। এই যুক্তি একটি গভীর শ্রেণীভিত্তিক ও পুরুষতান্ত্রিক অবস্থান তুলে ধরে, যেখানে পুরুষদের “ভোগ” বৈধ, কিন্তু নারীর “পেশা” অবৈধ! এই দ্বিচারিতা ভেঙে ফেলতেই শ্রমিক স্বীকৃতি জরুরি। নৈতিকতার নামে যদি আমরা তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করি, তবে তাদের প্রতি চলা সহিংসতা ও শোষণও বৈধতা পেয়ে যাবে।
সম্প্রতি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন দেশের প্রচলিত শ্রম আইনে যৌনকর্মী ও গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের সুপারিশ করেছে। শনিবার রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে এই সুপারিশ তুলে ধরেন কমিশন প্রধান ও নারী পক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন পারভিন হক। কমিশনের মতে, যৌন পেশা বাংলাদেশে অবৈধ নয়, তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট আইন না থাকায় যৌনকর্মীরা নানা ধরনের হয়রানি, বৈষম্য ও অনিরাপত্তার মুখোমুখি হন। তারা আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হন। শ্রমিক স্বীকৃতি না থাকায় আইনের সুরক্ষা তাদের জন্য কার্যত অকার্যকর। গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রেও একই রকম অবস্থা বিদ্যমান। কমিশনের মতে, এ দুই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শ্রমিক স্বীকৃতি দিলে তারা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হবেন।
যৌন কর্মীরা সমাজের প্রান্তিক এক গোষ্ঠী। তারা নিছক ‘ভোগ্যপণ্য’ নয়, বরং জীবিকা নির্বাহকারী নারী, যারা একটি পেশার মাধ্যমে বেঁচে থাকতে চাইছেন। তাদের শ্রমিক স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া নয়, এটি মানবিকতা, সমতা ও সুবিচারের পথে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।


