ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সীমিত স্থল অভিযান শুরু করে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ বিস্তৃত করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য হিজবুল্লাহ। ইসরায়েল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাঙার পর, অভিযান তীব্রতর করে এবং হিজবুল্লাহর সেক্রেটারি জেনারেল হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করে। এই সাফল্য প্রমাণ করে, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর নেটওয়ার্কের অনেক গভীরে তাদের গুপ্তচরদের প্রবেশ করাতে পেরেছে। হিজবুল্লাহর জন্য এটি একটি বড় আঘাত। হিজবুল্লাহ মূলত ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবানন দখলের বিরুদ্ধে একটি শিয়া প্রতিরোেধ গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠে এবং সময়ের সাথে লেবাননের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়, ইরান এবং সিরিয়ার জোরালো সমর্থন পেয়ে।
২০০৬ সালে গেরিলা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং বলা হয় যে ওই যুদ্ধে হিজবুল্লাহ একভাবে হয়তো জয়ীও হয়েছিলো। কিন্তু এই অনুমানিক ‘জয়’ই শেষপর্যন্ত হিজবুল্লাহর জন্য বড় একটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিজ ভূখণ্ডে লড়াই করা একটি গেরিলা বাহিনী কেবল তখনই সফল হতে পারে, যতক্ষণ তারা তাদের মূলনীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকে-তাদের ভূমির প্রতি নিবেদিত, হালকা অস্ত্রে সজ্জিত, চটপটে ও গতিশীল যোদ্ধাদের একটি ক্ষুদ্র দল হিসেবে। কিন্তু হিজবুল্লাহ অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত একটি বৃহৎ সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের দ্বৈত ভূমিকা নিলে, নেতৃত্বের মধ্যে ফাটল অনিবার্য হয়ে পরে।
হিজবুল্লাহ বড় সংগঠনে পরিণত হলে তাদের যুদ্ধ কৌশলে পরিবর্তন আনে কিন্তু, রাজনৈতিকভাবে জড়িত হওয়ায় অথবা দূরদর্শিতার অভাবে হিজবুল্লাহর পারদর্শিতা কমতে থাকে এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ও অনুপ্রবেশের শিকার হয়। হিজবুল্লাহ যখন বড় রাজনৈতিক সত্তায় রূপান্তরিত হয়, ইসরায়েলের পক্ষে হিজবুল্লাহর দুর্বল সদস্যদের খুঁজে বের করা এবং প্রলুব্ধ করে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করা সহজ হয়ে যায়। বছর বছর ধরে সংগৃহীত তথ্য পেজার এবং ওয়াকি-টকির সরবরাহ ব্যবস্থায় এক্সেস দেয়। এবং ইরানে বছর বছর ধরে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ধাঁচে, ইসরায়েল একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করে, যা হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে নজরদারিতে রাখে।
এমনও হতে পারে যে লেবাননের উত্তর ফ্রন্টে ইসরায়েলের আক্রমণে তার নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব আছে। ধর্মীয় চরমপন্থী দলগুলো বর্তমান ইসরায়েল সরকারের বিশাল একটা অংশ। তাই হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘাত এবং গাজায় চলমান সহিংসতা ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ সুবিধাজনক। একসময় কোণঠাসা হয়ে থাকা এখনকার ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ধর্মভিত্তিক আদর্শকে ব্যাবহার করতে পারছে। এই ধরনের পরিবেশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে গাজায় অপারেশন এবং এর ফলে সৃষ্ট বেসামরিক মৃত্যুকে বাইবেলীয় ন্যারেটিভের সাথে গুলিয়ে দিতে সাহায্য করছে।
ইসরায়েল এমন একটা দেশ যারা সবসময় তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটি চিরস্থায়ী সংঘাতের ভেতর রয়েছে। আমেরিকান উদারতা এবং বৃহত্তর পশ্চিমা (হলোকাস্ট থেকে আসা) অপরাধবোধ ইসরায়েলকে এমন সহিংস আচরণ করতে দেয় যা অন্যত্র কূটনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। ইসরায়েল যে সংঘাতগুলোর মোকাবিলা করে তাতে একটি নির্দিষ্ট দায়মুক্তি রয়েছে। আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার জন্য মার্কিন নির্বাচনি প্রচারণার শেষ পর্যায় একটি ভালো সময়। আজকে যখন আমেরিকার মনোযোেগ নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কেন্দ্রীভূত, তখন ইসরায়েলের জন্য নতুন যুদ্ধ শুরু করা কৌশলগতভাবে উপযুক্ত সময়, কারণ এখন তারা অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।


