মেডিটেশন এবং মাইন্ডফুলনেস আজকের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দীর্ঘদিন ধরে এগুলোকে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানোর কার্যকর, সহজ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং দেখিয়েছে মেডিটেশন সবসময় সবার জন্য উপকারী নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর মানসিক সমস্যার কারণও হতে পারে।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি ব্যাপক গবেষণায় প্রায় ১০% নিয়মিত মেডিটেটররা অন্তত এক মাসের জন্য নেতিবাচক মানসিক প্রভাব অনুভব করেছেন। এই নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বিচ্ছিন্নতা (dissociation) এবং সাইকোসিসের মতো জটিল মানসিক অবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রভাবগুলি শুধুমাত্র পূর্বে মানসিক রোগে ভুগে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানসিক রোগের ইতিহাস নেই এমন এবং মাঝারি মাত্রায় মেডিটেশন অভ্যাসকারী ব্যক্তির মধ্যেও দেখা গেছে।
এই গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, মেডিটেশন একটি “নিরাপদ” পদ্ধতি হিসেবে একেবারে সার্বজনীন নয়। এর পরিবর্তে এটি একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, মেডিটেশনের ধরন, সময়কাল এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে।
মাইন্ডফুলনেস এখন একটি বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। কোচিং, মোবাইল অ্যাপ, ওয়ার্কশপ এবং অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও, এই বাজার খুব কমই ব্যবহারকারীদের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে। গবেষক ও সমালোচকরা বলছেন, এই বাণিজ্যিকীকরণের ফলে মাইন্ডফুলনেসের জটিলতা ও ঝুঁকিগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে এবং এটি একটি ‘সুপারফিশিয়াল’ ও ‘ওভারসিম্প্লিফায়েড’ পণ্য হিসেবে গড়ে উঠছে।
রোনাল্ড পার্সারের McMindfulness বইয়ে এ বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মাইন্ডফুলনেস এখন পুঁজিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে মূলত লাভ ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য এর ঝুঁকি ও নেতিবাচক দিকগুলো লুকানো হচ্ছে।
বিশেষ করে শিশু ও সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাইন্ডফুলনেস প্রোগ্রাম চালানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যে ৮,০০০ শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাইন্ডফুলনেস শিশুদের মানসিক সুস্থতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনে নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, শিশুদের জন্য মাইন্ডফুলনেস প্রোগ্রাম চালানোর আগে আরও গভীর গবেষণা ও সতর্কতা প্রয়োজন।
১৯৭৬ সালে মনোবিজ্ঞানী আর্নল্ড লাজারাস মেডিটেশনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অসাবধানতার সঙ্গে মেডিটেশন করলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্কিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই পূর্বাভাসকে সমর্থন করে এবং দেখায় যে, মেডিটেশন মানসিক অবস্থা পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া, যা সঠিক নির্দেশনা ও পরিবেশ ছাড়া বিপজ্জনক হতে পারে।
মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেসের সুফল অস্বীকার করার নয়, তবে এর ঝুঁকি ও নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে অবহেলা করাও উচিত নয়। গবেষণামূলক প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, মেডিটেশনকে একটি ‘সকলের জন্য নিরাপদ’ পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করা ভুল। এর পরিবর্তে ব্যবহারকারীদের যথাযথ শিক্ষা, নির্দেশনা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিরাপদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এছাড়া মাইন্ডফুলনেস শিল্পকে আরও স্বচ্ছ ও নৈতিকভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে ব্যবহারকারীরা ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন হন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন।


