মার্কাস অরেলিয়াস – ইউরোপের অন্ধকার যুগে যে সম্রাট আলোর খোঁজে কাটিয়েছিলেন

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের এক অন্ধকার সময়ে যখন মহামারি ও যুদ্ধ ইউরোপকে গ্রাস করছিল তখন সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, দার্শনিক বিশ্বাস এবং একজন ভালো শাসক ও মানুষ হওয়ার উপায় নিয়ে লিখেছিলেন এক অনন্য গ্রন্থ, ‘মেডিটেশনস’। এটি কোনো সাধারণ বই ছিল না, ছিল একজন সম্রাটের একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার এক সংকলন, যা পরবর্তী সহস্রাব্দে অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

মার্কাস অরেলিয়াসের চিন্তাভাবনার মূল ভিত্তি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ শতকে গ্রিসের জেনো অব সিটিয়াম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দর্শন স্টোইসিজম। স্টোইসিজমের মূল কথা হলো, জীবনের প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে ভেতরের শক্তিকে বিকশিত করা। এই দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের ভালো থাকা বা সুখ নির্ভর করে সদ্‌গুণ এবং যুক্তির ওপর, বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর নয়।

মার্কাস অরেলিয়াস নিজে একজন শিক্ষিত এবং অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন, তিনি তার ব্যক্তিগত শিক্ষক কুইন্টাস জুনিয়াস রাসটিকাসের মাধ্যমে এই দর্শনের সংস্পর্শে আসেন। রাসটিকাস তার অস্থির এবং উদ্ধত চরিত্রকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন এবং স্টোইক দার্শনিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

‘মেডিটেশনস’ গ্রন্থে মার্কাস অরেলিয়াস তার গুরু এপিটেটাসের ‘এনচিরিডিয়ন’ (Manual) থেকে বেশ কিছু নীতি গ্রহণ করেছেন। এপিটেটাস কজন প্রাক্তন দাস ছিলেন। কিন্তু তিনি কেবল পূর্বসূরিদের আদর্শ অনুসরণ করেননি, তার নিজস্ব মৌলিক চিন্তাভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের উপলব্ধিই হলো প্রকৃত জ্ঞানের ভিত্তি। জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়ে সদ্‌গুণের অনুশীলনই সুখের পথ।

‘মেডিটেশনস’ কোনো পরিকল্পিত গ্রন্থ ছিল না। এটি ছিল মার্কাস অরেলিয়াসের ব্যক্তিগত জার্নাল, যা তিনি যুদ্ধের মাঝে, সামরিক ছাউনিতে, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে বসেও লিখতেন। তার লেখাগুলো ছিল অনেকটা বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনার মতো, কখনো সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ, আবার কখনো গভীর দার্শনিক আলোচনা। এই লেখাগুলো থেকে বোঝা যায়, একজন রোমান সম্রাট হিসেবে জীবনযাপন করা কতটা কঠিন ছিল, বিশেষত যখন একজন স্টোইক হিসেবে জীবন ধারণ করার চেষ্টা করা হয়।

মার্কাস অরেলিয়াস তার দায়িত্ববোধের বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন তাকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে যা জনগণের জন্য সর্বোত্তম।

তিনি লিখেছেন, “প্রতিটি দিন শুরু করো নিজেকে এই কথা বলে: আজ আমি বাধা, অকৃতজ্ঞতা, ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসঘাতকতা, বিদ্বেষ এবং স্বার্থপরতার সম্মুখীন হব… এর কোনোটিই আমাকে আঘাত করতে পারবে না, কারণ কেউ আমাকে এমন কাজে জড়াতে পারবে না যা আমাকে হেয় করে।”

এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, তিনি তার সম্রাটের দায়িত্বকে কতটা কঠিন মনে করতেন এবং স্টোইক দর্শন তাকে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে সাহায্য করত।

‘মেডিটেশনস’ গ্রন্থের শুরুতেই মার্কাস অরেলিয়াস তার জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি তার শিক্ষক, পিতামাতা এবং অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন, যারা তাকে কুসংস্কার ও মন্দ অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে এবং একটি গুণী জীবন ধারণে সহায়তা করেছেন।
তবে তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু দিক তার লেখায় উঠে এসেছে। তিনি অনেক মানবিক বিষয় নিয়ে লিখেছেন যেগুলো তাকে বিরক্ত করত।

তিনি গ্ল্যাডিয়েটরদের খেলা ঘৃণা করতেন, যৌনতাকে তিনি “এক ক্ষণিকের আবেশ” হিসেবে দেখতেন। তিনি সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিও বিরক্তি প্রকাশ করতেন, যারা ক্ষমতা বা ঐশ্বর্যের মোহে আচ্ছন্ন ছিল। তিনি তার লেখায় সিনেটর এবং সম্রাটদের পরা বেগুনি পোশাককে “ভেড়ার পশম, যা শামুকের রক্তে রাঙানো” বলে উপহাস করেছেন।

স্ত্রী ফাউস্টিনার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা ফাউস্টিনাকে নিয়ে খারাপ কথা বললেও মার্কাস অরেলিয়াস তাকে “এত বাধ্য, এত স্নেহময়ী এবং এত সহজ-সরল” বলে বর্ণনা করেছেন। তাদের ১৩ জন সন্তান ছিল, কিন্তু মাত্র ছয়জন শৈশব পার করতে পেরেছিল। ফাউস্টিনার মৃত্যুর পর মার্কাস অরেলিয়াস গভীর শোক প্রকাশ করেন।

যুদ্ধে অবস্থানকালে তিনি অনেক অন্ধকার দিক নিয়েও ভেবেছেন। তিনি যুদ্ধের ভয়ংকর বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন এভাবে –
“তুমি কি কখনো বিচ্ছিন্ন হাত বা পা দেখেছো, বা একটি বিচ্ছিন্ন মাথা, যা তার দেহ থেকে অনেক দূরে পড়ে আছে…?”

এই চিন্তাগুলো তাকে বারবার আঘাত করেছে। তবুও তিনি নিজেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাতের দার্শনিককে দিনের বেলায় একজন সামরিক নেতা হতে হয়।

‘মেডিটেশনস’ জুড়ে মার্কাস অরেলিয়াস বারবার জীবনের ক্ষণস্থায়ীতার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত এবং তুচ্ছ। গতকাল ছিল এক ফোঁটা শুক্রাণু; আগামীকাল হবে ছাই।”

এই ক্ষণস্থায়ীতা তাকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। তিনি বলেছেন, “এমনভাবে প্রতিটি কাজ করো যেন এটি তোমার জীবনের শেষ কাজ।” তিনি অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে কেবল বর্তমানের ওপর মনোযোগ দিতে বলেছেন।

মার্কাস অরেলিয়াসের সবচেয়ে বড় অন্বেষণ ছিল মনের শান্তি। তিনি বলেছেন, “অস্তিত্ব আমাদের পাশ দিয়ে নদীর মতো বয়ে যায়।” এই ক্ষণস্থায়ীতার আলোকে তিনি মনে করতেন সবচেয়ে ভালো পথ হলো নিজের কর্তব্য পালন করা, অন্যদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা এবং সব কিছুকে যুক্তির দ্বারা বিচার করা।

তার কাছে মৃত্যু কোনো দুঃখের বিষয় ছিল না। তিনি মৃত্যুকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “মৃত্যুকে ঘৃণা করো না, বরং একে স্বাগত জানাও।” মৃত্যুকে তিনি একটি জলপাইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা পেকে গাছ থেকে পড়ে যায় এবং তার জন্মদাত্রী মায়ের প্রশংসা করে।

মার্কাস অরেলিয়াসের এই জীবন-দর্শন তার মৃত্যুর পরেও অমর হয়ে আছে। তার লেখাগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। চীন থেকে আমেরিকার বহু বিখ্যাত ব্যক্তি তার লেখাকে তাদের জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে একজন সম্রাটের ব্যক্তিগত ভাবনাগুলোও কীভাবে সময়ের সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন সত্যে পরিণত হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন