মায়ান ক্যালেন্ডার ও টাইমকিপারদের শেষ সংকেত !

মধ্য আমেরিকার প্রাচীন মায়ান সভ্যতা তাদের জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও স্থাপত্যশিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তাদের দিনপঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার নিয়ে। বিশেষ করে ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বরের তারিখটি অনেকের কাছে ছিল পৃথিবীর শেষের দিন। কিন্তু এই দিনটি আসলে কী বোঝাত? মায়ান ক্যালেন্ডারের পেছনের গূঢ় রহস্য কী?

মায়ানরা সময়কে গণনা করতেন একটি অত্যন্ত জটিল পদ্ধতিতে, যা ছিল ‘দীর্ঘ গণনা চক্র’ বা Long Count Calendar। তাদের ক্যালেন্ডার ৩১১৪ খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হয়ে ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি পূর্ণচক্র সম্পন্ন করে। এই দিনটিকে তারা চিহ্নিত করেছিল ১৩.০.০.০.০ (১৩ ব্যাক্টুন), যা ছিল একটি মহাচক্রের সমাপ্তি।

মায়ান ক্যালেন্ডারে একটি বছর ছিল ৩৬৫ দিন, যা ১৮ মাসে বিভক্ত ছিল, প্রতিমাসে ২০ দিন করে। এছাড়া ছিল ৫ অতিরিক্ত দিন, যাদেরকে তারা ‘ভায়েব’ নামে ডাকে। এই সূক্ষ্ম গণনার মাধ্যমে তারা সূর্যের অয়ন, নক্ষত্রের অবস্থান এবং মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করত। বিশেষ করে ২১ ডিসেম্বরের দিনটি ছিল সূর্যের দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবেশের দিন, অর্থাৎ ‘সাউদার্ন সলস্টিস’।

২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর মায়ান ক্যালেন্ডারের মহাচক্র শেষ হওয়ার কারণে অনেকেই ভেবেছিলেন, সেটি পৃথিবীর শেষের দিন। এই ধারণাটি বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায় এবং বিভিন্ন কনস্পিরেসি থিওরি জন্ম নেয়। তবে মায়ান পণ্ডিতদের মতে, এটি কোনো প্রলয় বা ধ্বংসের দিন নয়, বরং একটি সময়চক্রের পুনঃসূচনা বা রিসেটের সূচনা।

মায়ানরা সময়কে একটি চক্র হিসেবে দেখত, যেখানে এক চক্র শেষ হলে নতুন চক্র শুরু হয়। তাই ২০১২ সালের শেষ দিনটি ছিল এক যুগের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনা। মায়ানদের কাছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছিল পবিত্র বৃক্ষ, আর সূর্যের গ্রহণরেখা অতিক্রম করা ছিল মহাজাগতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাই এই দিনটি ছিল সময়ের পুনর্গঠনের প্রতীক।

২০১২ সালের পর যখন পৃথিবী ধ্বংস হয়নি, তখন অনেকেই এই ধারণাকে গুজব মনে করেন। কিন্তু পরবর্তীতে গবেষকরা বুঝতে পারেন, মায়ান ক্যালেন্ডারের হিসাবের সঙ্গে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের মিলিয়ে একটি ৮ বছরের পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, মায়ান ক্যালেন্ডারের আসল শেষ দিনটি ২০২০ সালে এসেছে।

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন সংকট দেখা দেয়, যা অনেককে আবারও মায়ান ক্যালেন্ডারের প্রলয়দিবসের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও বিজ্ঞানীরা এটিকে সময়ের পুনঃচক্রের একটি ভুল ব্যাখ্যা বলেই দেখেন।

মায়ানরা তাদের সময় গণনায় অত্যন্ত নিখুঁত ছিলেন। তাদের ‘ত্জোল্ক’ইন’ নামে একটি ২৬০ দিনের ধর্মীয় ক্যালেন্ডার ছিল, যা সৌরচক্রের সাথে মিলিয়ে ব্যবহার করা হতো। এই ক্যালেন্ডারে দিনগুলোকে বিভিন্ন দেবতা ও শক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

গুয়াতেমালার একটি প্রাচীন পিরামিডের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া মায়ান ক্যালেন্ডারের প্রাচীনতম নিদর্শন প্রমাণ করে, তারা হাজার বছরেরও বেশি আগে থেকে সময়ের জটিল হিসাব করত। তাদের এই জ্ঞান আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জন্যও চমকপ্রদ।

মায়ান ক্যালেন্ডারের শেষ দিনকে কেন্দ্র করে বহু ভুল ব্যাখ্যা ও গুজব ছড়িয়েছে। অনেকেই এটিকে পৃথিবীর ধ্বংসের দিন হিসেবে দেখেছেন, যা ভিত্তিহীন। আসলে এটি ছিল একটি মহাচক্রের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনা। মায়ানদের সময়চক্র ছিল চলমান, যেখানে শেষ কোনো নির্দিষ্ট বিন্দু নেই। তাই ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর ছিল একটি সময়ের রূপান্তর, ধ্বংস নয়।

মায়ান ক্যালেন্ডারের ২০১২ সালের শেষ দিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আতঙ্ক ও গুজব ছড়িয়েছিল, তা ছিল মূলত ভুল ব্যাখ্যা ও আধুনিক কনস্পিরেসি থিওরির ফল। ২০১২ সালের দিনটি ছিল সেই মহাচক্রের শেষ এবং নতুন যুগের সূচনা। এটি ছিল এক ধরনের ‘টাইমকিপারদের’ সংকেত, যা সময়ের পুনঃসেট বা রিসেটের প্রতীক। তাই এটি ধ্বংসের নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা। মায়ান সভ্যতার এই জটিল ক্যালেন্ডার ও সময়ের ধারণা আজও আমাদেরকে সময়ের গভীর রহস্য ও মহাজাগতিক চক্র সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন