মাদ্রিদ ডার্বি ফুটবল মাঠে শ্রেণীর লড়াই

মাদ্রিদ ডার্বির নাম শুনেছেন? বুঝতে পারছেন কাদের কথা বলছি? বলছি, স্পেনের মাদ্রিদ শহরের বিখ্যাত দুই ফুটবল টিম আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং রিয়াল মাদ্রিদের কথা ও ফুটবল মাঠে দুই মাদ্রিদের দেখা হলে সেটা আর ফুটবল ম্যাচ থাকে না, পরিণত হয় যুদ্ধে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মজার একটা পৌরাণিক উপাদান আছে ও রিয়েলের ফ্যানরা পছন্দ করেন পৌরাণিক দেবী সিবেলেসকে আর আতলেতিকোর ফ্যানরা পছন্দ করেন সমুদ্রের দেবতা নেপচুনোকে। দুই ক্লাবের মধ্যে ঐতিহাসিক একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর বিভেদ আছে। বিভেদটা শ্রেণিবৈষম্যের, শ্রমজীবী শ্রেণি বনাম এস্টাব্লিশমেন্টের, আন্ডারডগ বনাম রাজকীয় দলের। আতলেতিকোকে বলা হয় লস কোলচোনেরোস (The mattress makers বা তোশক নির্মাতা) আর রিয়েলকে বলা হয় লস ব্লাঙ্কোস (The whites) – ডাক নাম শুনেইতো আসলে বোঝা যায় এই দুই ক্লাবের সমর্থকদের বিবাদ অথবা বিভেদটা মূলতঃ শ্রেণীবৈষম্যের।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা ১৯০৩ সালে। ওই বছর অ্যাথলেটিক ডি বিলবাও দল মাদ্রিদকে হারিয়ে স্পেনের চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নিয়েছিল। খেলা শেষে অ্যাথলেটিক ডি বিলবাওয়ের কিছু ভক্ত সিদ্ধান্ত নেন যে রাজধানী মাদ্রিদেই বিলবাওয়ের মতো একটি দল দরকার। তার এক মাসের মধ্যেই মাদ্রিদে অ্যাথলেটিক ক্লাব ডি মাদ্রিদ, বিলবাও ক্লাবের একটি শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে, সেই সময়ের মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবের (বর্তমান রিয়েল মাদ্রিদ) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জুলিয়ান পালাসিওস, ফুটবলের প্রতি যার ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল তার ইংরেজ বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলা থেকে। ১৯০৪ এবং ১৯০৮ সালের মধ্যে, রিয়েল মাদ্রিদ চারটি কোপা ডেল রে জিতে এবং ১৯১২ সালে রাজা আলফোনসো XIII এর কাছ থেকে ‘রিয়াল’ বা ‘রাজকীয়’ উপাধি লাভ করে।

একই সময়ে, অ্যাথলেটিক ডি মাদ্রিদ তাদের প্রথম ম্যাচ খেলে বিখ্যাত লাল এবং সাদা স্ট্রাইপ জার্সি পড়ে, যার জন্য তারা লস কোলচোনেরোস (তোশক নির্মাতা) নামে পরিচিতি পায়। ১৯২৩ সালে আতলেতিকো দে মাদ্রিদ বিলবাও অ্যাথলেটিক ক্লাবের থেকে ছিন্ন হয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ক্লাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। িযুদ্ধোত্তর সময়ে রিয়েলের সফলতা আসে সান্তিয়াগো বার্নাবেউয়ের ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর থেকে। তার নেতৃত্বে, ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে রিয়েল পাঁচটি ইউরোপীয় কাপ জিতে। স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কো রিয়েলের এই সাফল্যকে তার কেন্দ্রিকৃত, ঐতিহ্যবাহী স্পেনের স্বপ্নের প্রতীক হিসেবে দেখেন। ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে রিয়েল আবারও স্প্যানিশ ফুটবলে রাজকীয় প্রতীকে পরিণত হয়।

আতলেতিকোর সাফল্য আসে কিংবদন্তি লুইস আরাগোনেসের হাত ধরে, যিনি এক সময় রিয়েলে খেলতেন। আতলেতিকোর হয়ে তিনি দুটি কোপা দেল রে, আর তিনটি লিগ শিরোপা জিতেছিলেন ও তাছাড়া ১৯৬৯/৭০ মৌসুমে তিনি লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে পিচিচি পুরস্কারও জিতেন। যদিও আতলেতিকোর এই সাফল্য রিয়েলের সাফল্যের তুলনায় কিছুই না, তবুও আতলেতিকোর জন্য এটি ছিলো অনেক কিছু। অবসর নেওয়ার পর আরাগোনেস তাদের ম্যানেজার হন এবং ম্যানেজার হিসেবে তিনি একটি লিগ শিরোপা এবং চারটি কোপা দেল রে জিতেছিলেন।
বর্তমানে এই দুই ক্লাবের পরিচয় ফুটে উঠে তাদের বাজেট আর ফুটবল খেলার ধরণে। এই মুহূর্তে আতলেতিকোকে টানছেন দিয়েগো সিমেওনে এবং রিয়েলকে টানছেন তাদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। পেরেজের সময়েই রিয়েলে গ্যালাক- টিকোস নীতি শুরু হয়, যার কারণে বিশ্বের সেরা সব খেলোয়াড়দেরকে রিয়েলের হয়ে খেলতে দেখা যায়। পেরেজের অধীনে রিয়েল জিতেছে আরও ছয়টি চ্যাম্পিয়নস লিগ – সবমিলিয়ে রিয়েল এখন – পর্যন্ত ১৩টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে, বিশ্বের কোনো দলই এত বেশি জিতেনি।

অন্যদিকে স্প্যানিশ লীগের দুই উচ্চব্যায়ী ক্লাবের (রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা) দাপটের মাঝেও সিমেওনের কম ব্যয়ের, কম জাঁকজমকপূর্ণ, কঠোর পরিশ্রমী আতলেতিকো দুটো লিগ শিরোপা জিতেছে এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও খেলেছে, কিন্তু কাকতালীয়ভাবে ফাইনালে তারা পেরেজের রিয়েলের কাছে হেরে গিয়েছিলো।

সিমেওনের আতলেতিকো কঠোর পরিশ্রম, একতা এবং অধ্যবসায়ের মূর্ত প্রতীক। তাদের ফুটবল খেলার ধরণ বার্সা অথবা রিয়েলের চেয়ে কম সুন্দর কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার কারণে সিমিওনের দল সমর্থকদের কাছে অনেক জনপ্রিয়। শ্রমজীবী শ্রেণীকে রিপ্রেসেন্ট করা এই মাঝারি বাজেটের দলটি রিয়েলের মতো অভিজাত আর ধনী ক্লাবের সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং মাঝে মাঝে জিতছেও। মাদ্রিদ ডার্বি এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রতীক্ষিত এবং উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ, যে খেলায় এখনো শতাব্দী পুরনো সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রদর্শনী ঘটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন