সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের কন্যা রাজিয়া মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী নারী শাসক ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ‘সুলতান রাজিয়াতুদ দুনিয়া ওয়াদ দীন’ উপাধি নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তবে তার সিংহাসনে আরোহণ সহজ ছিল না। তার বৈমাত্রেয় ভাই মুয়িযউদ্দিন বাহরাম এবং তৎকালীন আলেমগণ তার শাসন ক্ষমতার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু দক্ষ প্রশাসক ও যোগ্য সমরকুশলী হিসেবে তিনি তার যোগ্যতার প্রমাণ দেন। রাজিয়া নারী হওয়ায় তাকে নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি ছিল প্রবল। কিন্তু তিনি হার মানেননি। আত্মবিশ্বাস এবং শক্ত মনোবল নিয়ে তিনি জনসমর্থন আদায়ের কৌশল গ্রহণ করেন। কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদে গিয়ে তিনি জনগণের সমর্থন চাইতেন, যা তখন নারীদের জন্য এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ ছিল। তিনি ভারতবর্ষে নারীদের মসজিদ নির্মাণে পথিকৃতের ভূমিকা রাখেন।
রাজিয়া ছিলেন স্বাধীনচেতা, দূরদর্শী ও দক্ষ শাসক। তিনি ঘোড়া ও হাতি চড়ায় পারদর্শী ছিলেন এবং নিয়মিতভাবে মাদ্রাসা ও মসজিদ পরিদর্শন করতেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক খানকা ও মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মিনহাজ সিরাজ জুযজানির মাদ্রাসা তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষণায় পরিচালিত হয়েছিল। মধ্যযুগে মুসলিম নারীরা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর তার পরিবারের নারীদের পরামর্শ নিতেন। নুরজাহান ছিলেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শক্তিশালী পরামর্শদাতা। আকবরের দুধমা মাহাম আঙ্গা সাম্রাজ্যের শুরুর দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
মাহাম আঙ্গার নির্মিত খায়রুল মানাজিল মসজিদ দিল্লির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন। মসজিদের প্রধান খিলানে তার নাম খোদাই করা আছে। পাশেই তিনি একটি মাদ্রাসাও নির্মাণ করেছিলেন, যা ইসলামী শিক্ষার প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাহাম আঙ্গার দেখানো পথে অনেক মোগল নারীরা হেঁটেছেন। তারা হয়তো নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাননি, তবে ধর্মীয় পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বহু মসজিদ নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশেও অনেক নারী মসজিদ নির্মাণ করেছেন। ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদ বিনত বিবি মসজিদ, যা পঞ্চদশ শতকে নির্মিত হয়। বাগেরহাটে বিবি বেগনির মসজিদ ষোড়শ শতকে নির্মিত হয়। বিবি মেহের মসজিদ (১৮১৪) এবং নারায়ণগঞ্জের বিবি মরিয়ম মসজিদ নারীদের অবদানের সাক্ষ্য বহন করে।
বাগেরহাটের বিবি বেগনি মসজিদ ইটের তৈরি সুদৃশ্য একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপত্য। এর চার কোণে চারটি মিনার রয়েছে। মসজিদের বাইরের দৈর্ঘ্য ১৬.১৫ মিটার, ভেতরে ১০.০৫৮ মিটার। দেয়ালের পুরুত্ব ৩.০৪৮ মিটার। পূর্ব দেয়ালে তিনটি খিলানাকার প্রবেশপথ, পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। মিহরাবের বিশেষ স্থাপত্যশৈলী এটিকে অন্যান্য মসজিদ থেকে পৃথক করেছে। মসজিদে টেরাকোটার শিকল নকশা, গোলাপ ও খাঁজকাটা খিলানের নিদর্শন দেখা যায়। মধ্যযুগের অনেক মসজিদে নারীদের জন্য পৃথক নামাজের স্থান ছিল। দিল্লির ওয়াজিরাবাদ মসজিদে সুদৃশ্য জালি দিয়ে ঘেরা একটি কক্ষ রয়েছে, যা নারীদের নামাজের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বাংলার পাণ্ডুয়ায় অবস্থিত আদিনা মসজিদেও একই রকম সংরক্ষিত স্থান ছিল।
সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক মামলুক সাম্রাজ্যের ভিত স্থাপন করার পর থেকে নারীরা সুফিদের খানকা ও দরগায় যাতায়াত করতেন।উনিশ শতক পর্যন্ত এই রীতি অব্যাহত ছিল। সুফি প্রথায় নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল এবং অনেক খানকায় নারীদের জন্য নামাজের স্থান সংরক্ষিত থাকত। সুলতান রাজিয়া থেকে শুরু করে মাহাম আঙ্গা ও অন্যান্য মুসলিম নারীদের অবদান ভারতীয় উপমহাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তারা শুধু শাসনব্যবস্থা নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা আজও নারীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।


