মাস কয়েক ধরে প্রবাসী আয়ে সুবাতাস বইছে, রেকর্ডও হয়েছে; তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হিসাবটা আশা জাগানিয়া নয়। এক বছরের ব্যবধানে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা ২২ শতাংশের মত কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকটি দেশের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য সংকুচিত হওয়ার তথ্য মিলেছে।
জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, প্রবাসীদের শ্রমের বিনিময়ে ডলার বাংলাদেশ পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ নেই। বাজার ছোট হয়ে আসার কারণ হিসেবে দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ার ‘অনৈতিক চর্চার’ কথাও বলছেন কেউ কেউ।
চলতি বছরের মার্চে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠান ৩২৯ কোটি ডলার, যা মাসের হিসাবে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে রেমিটেন্স বাবদে দেশে এসেছে দুই হাজার ১৭৮ কোটি ডলার। যা আগের বছর এই সময়ের তুলনায় ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।
রেমিটেন্সের প্রবাহ আশা জাগালেও অভিবাসী শ্রমিক পাঠানোতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমান।
২০২৪ সালে সেটি কমে নেমেছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জনে। কমেছে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৪৮৪ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২২ শতাংশ। গত কয়েক বছরের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রম বাজার পুরোপুরি বন্ধ; কিছু দেশে ‘প্রায় বন্ধ’। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান ৯৮ হাজার ৪২২ জন। ২০২৪ সালে সেটি কমে ঠেকেছে ৪৭ হাজার ১৬৬ জনে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কুয়েতে ২০২৩ সালে কর্মী গেছেন ৩৬ হাজার ৫৪৮ জন। ২৪ সালে যান ৩৩ হাজার ৩১ জন।
চুক্তিমাফিক চাকরি এবং বেতন নিশ্চয়তার জন্য বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অন্যতম সেরা শ্রমবাজার দক্ষিণ কোরিয়া। ভাষা ও কাজের দক্ষতা দেখে কর্মী নেওয়া এ দেশেও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের কোটা দেয় দক্ষিণ কোরিয়া; কিন্তু যায় চার হাজার ৯৯৬ জন। পরের বছর এ সংখ্যা আরও প্রায় দুই হাজার কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ৩৮ জনে।
ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্যে ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৩৮৩ জন গেলেও ২০২৪ সালে যান তিন হাজার ৫৫০ জন। ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতে ১৬ হাজার ৮৭৯ জন পাড়ি জমান ২০২৩ সালে। পরের বছর কমে দাঁড়ায় এক হাজার ১৬৪ জন।
গেল বছরের মতো এ বছরও নতুন কোনো শ্রমবাজার খোলেনি বাংলাদেশিদের জন্য। উল্টো ২০২৩ এর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে চলতি বছর পর্যন্ত ওমান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপের মতো বেশ কিছু পুরনো শ্রমবাজারও বন্ধ হয়েছে।
২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে অঘোষিতভাবে বন্ধ আছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার। এছাড়া জনশক্তি রপ্তানি অর্ধেকে নেমেছে ব্রুনাইয়ে; মরিশাসে বন্ধ রয়েছে ঘোষণা ছাড়াই, যুদ্ধবিদ্ধস্ত লেবাননেও নেই সুখবর।
২০১৭ সাল থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের একসময়ের বড় শ্রমবাজার বাহরাইনও বন্ধ রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটি কোনো কর্মীই নেয়নি। প্রায় একই অবস্থা লিবিয়া, সুদান, ইরাক, মিশরের মতো দেশগুলোতেও। এসব দেশের শ্রমবাজারও কার্যত বন্ধই বলা চলে।
নতুন করে কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে মালয়েশিয়াও। উল্টো বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেট নিয়ে দফায়-দফায় সতর্ক করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। অথচ ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন শ্রমিক নেয় দেশটি।
ওমানও কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে, যারা ২০২৩ সালে নেয় ১ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন কর্মী। ২০২৪ সালে সেটি কমে দাঁড়ায় ৩৫৮ জনে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গেছেন ২৪ জন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও কাজ না মেলায় বিপাকে রয়েছেন দেশটিতে যাওয়া শ্রমিকদের অনেকেই।২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যান ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন। ২০২৪ সালে সেটি বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৪ জনে।
আইনে নিষিদ্ধ হলেও কর্মীপ্রতি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় ভিসা কিনে নেয় দেশটিতে থাকা অনেকে। এরপর ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় দেশ থেকে ফ্রি ভিসার নামে লোক নিয়ে গেলেও সেখানে কাজ না পেয়ে ফিরে আসেন অনেকেই। অনেকেই আবার সীমাহীন কষ্টে দিনাতিপাত করেন। একই চিত্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারেও। ২০২৩ সালে ৫৬ হাজার ১৪৮ জন দেশটিতে গেলেও ২০২৪ সালে সেটি বেড়ে হয় ৭৪ হাজার ৪২২ জন।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন — “ক্রমাগত আমাদের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। আগে আমরা ১৩ থেকে ১৪টা দেশে লোক পাঠাতাম, যদিও বলছে ১৭০টি দেশে যায়। ওটা কমতে-কমতে ৯টা হয়েছে।”
২০২৪ সালে মাত্র ছয়টি দেশে ৯০ শতাংশ লোক গেছে দাবি করে তিনি বলেন, “বাহরাইন, আরব আমিরাত এসব বাজার বন্ধ হয়ে আছে। অফিসিয়ালি খোলা আছে, কিন্তু আসলে খোলা নাই। বাজারের সংকোচনটাকে আমি বড় সমস্যা হিসেবে দেখছি। মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণিকেও দায়বদ্ধ করতে হবে। এ বাজার জালিয়াতিতে ভরা। এ কারণে ওইসব দেশ কিছু দিন পর পর বাজার বন্ধ করে দেয়।”


