বিগ ব্যাং তত্ত্বের অমীমাংসিত যত প্রশ্ন

আমরা যে মহাবিশ্বে বাস করি তার শুরুটা কেমন ছিল? এটি কি অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান ছিল, নাকি এর একটি নির্দিষ্ট সূচনা ছিল? আর এর শেষ কি হবে? নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, গ্রহ মিলে আজকের এই বিশাল “মহাজাগতিক জাল” কিভাবে তৈরি হলো? একসময় এই প্রশ্নগুলো কেবল বিজ্ঞানের নাগালের বাইরে দার্শনিক আলোচনার বিষয় ছিল। কিন্তু গত এক শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ এবং তাত্ত্বিক উদ্ভাবনের ফলে আমাদের হাতে এসেছে বিগ ব্যাং তত্ত্ব। এটি মহাবিশ্বের উৎপত্তির এক অসাধারণ ব্যাখ্যা, যা বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপকভাবে গৃহীত এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নিয়েছে।

তবে এই তত্ত্বটি যতই চমৎকার হোক না কেন, এটিও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু পর্যবেক্ষণ বিগ ব্যাং তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূলে রয়েছে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণা। ১৯২৯ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এবং তার সহকর্মী মিল্টন হুমায়সন দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর গতি পর্যবেক্ষণ করে এক বিস্ময়কর তথ্য উদঘাটন করেন। তারা দেখতে পান বেশিরভাগ গ্যালাক্সিই আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং এই দূরে সরে যাওয়ার গতি তাদের দূরত্বের সমানুপাতিক। কিছু গ্যালাক্সি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে আলোর গতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে দূরে সরে যাচ্ছিল!

এই গতি-দূরত্বের সম্পর্কটি জর্জেস ল্যমেট্র নামক বেলজিয়ান তাত্ত্বিক অনেক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। বর্তমানে এটি হাবল-ল্যমেট্র সূত্র নামে পরিচিত। এই সূত্রের ধ্রুবকটি হলো হাবল ধ্রুবক, যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার নির্দেশ করে।

তবে গ্যালাক্সিগুলো আসলে কেবল দূরে সরে যাচ্ছে না, বরং মহাকাশ নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। একটি বেলুন ফোলানোর সময় বেলুনের গায়ে আঁকা দুটি বিন্দুর দূরত্ব যেমন বাড়ে, তেমনই মহাকাশের প্রসারণের কারণে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব পরিমাপের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সেফেইড পরিবর্তনশীল তারা নামক বিশেষ এক ধরনের তারাকে “স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল” বা “মহাজাগতিক বাতিঘর” হিসেবে ব্যবহার করেন। এই তারার আলোকরশ্মি দেখে তাদের দূরত্ব মাপা যায়। তবে উনিশ শতকের শেষের দিকে এই তারাগুলো সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত থাকায় দূরত্বের হিসাব প্রায়শই ভুল হতো, যার ফলে হাবল ধ্রুবক এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার বেশি অনুমান করা হতো। এই হিসাবটি সঠিকভাবে বের করতে প্রায় ৭০ বছর লেগে গিয়েছিল।

কিন্তু এই ছোটখাটো ত্রুটিগুলো মূল উপসংহারকে প্রভাবিত করেনি। যদি মহাকাশ প্রসারিত হয়, তবে সময়ের পেছনে গেলে এমন এক মুহূর্ত আসবে যখন মহাবিশ্ব অত্যন্ত উচ্চ ঘনত্ব এবং তাপমাত্রার এক বিন্দুতে সংকুচিত ছিল। এটিই ছিল স্থান, কাল, পদার্থ এবং বিকিরণ সবকিছুর আদি এবং অগ্নিময় উৎস। আমরা আজ যা দেখতে পাই, তার প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হোয়েল এই তত্ত্বটির নাম দেন “বিগ ব্যাং”।

বিগ ব্যাং তত্ত্ব কেবল মহাবিশ্বের সূচনার সময়টুকুই বলে না, বরং এটি কিভাবে বিকশিত হয়ে আজকের নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং গ্রহের মহাজাগতিক জালের রূপ নিয়েছে, তারও ব্যাখ্যা দেয়। এই তত্ত্ব আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমীকরণগুলোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আইনস্টাইন নিজে ১৯১৭ সালে মহাবিশ্বকে স্থির এবং অনন্ত বলে ধরে নিয়ে তার সমীকরণগুলো তৈরি করেছিলেন। কিন্তু দশ বছর পর ল্যমেট্র সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের একটি বিকল্প সমাধান খুঁজে পান। শুরুতে আইনস্টাইন এটিকে অত্যন্ত জঘন্য বললেও, হাবলের প্রমাণের মুখে তিনি নিজের ধারণা থেকে সরে আসেন।

১৯৩২ সালে উইলেম ডি সিটার-এর সাথে কাজ করে আইনস্টাইন এক নতুন মডেল উপস্থাপন করেন, যা আইনস্টাইন-ডি সিটার মডেল নামে পরিচিত। এই মডেলে মহাকাশ সম্প্রসারিত হয় এবং মহাবিশ্বে এমন পরিমাণ পদার্থ থাকে যা মহাকর্ষের মাধ্যমে সম্প্রসারণকে ধীর করে দেয়, অবশেষে অসীম সময়ে থামিয়ে দেয়। এই “সমালোচনামূলক” পরিমাণ পদার্থ মহাকাশকে “সমতল” বা ইউক্লিডিয়ান করে তোলে, যেখানে ইউক্লিডের জ্যামিতির নিয়ম প্রযোজ্য। এই মডেলটি দীর্ঘ দশক ধরে মহাজাগতিক গবেষণার ভিত্তি ছিল।

আইনস্টাইন-ডি সিটার মডেল আমাদের মহাবিশ্বের গল্প বলতে গিয়ে কিছু বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়। সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ প্রয়োগের জন্য কিছু অনুমান প্রয়োজন, যার মধ্যে একটি হলো মহাজাগতিক নীতি। এটি বলে বৃহৎ পরিসরে মহাবিশ্ব সর্বত্র একই রকম এবং সব দিকে একই রকম। কিন্তু যদি বিগ ব্যাং-এর একেবারে শুরুতে এমন হতো, তবে পদার্থ সব দিকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ত। মহাকর্ষ তখন সব দিকে সমানভাবে কাজ করত, ফলে কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির সৃষ্টি হতো না।

মহাবিশ্বের জন্য প্রয়োজন ছিল কিছু অসমসত্ত্বতা – অর্থাৎ, পদার্থের সামান্য কিছু অতিরিক্ত ঘনত্বযুক্ত অঞ্চল, যা নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির সৃষ্টির “বীজ” হিসেবে কাজ করত। আইনস্টাইন-ডি সিটার মডেলে এই অসমসত্ত্বতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সমস্যা এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন, আইনস্টাইন-ডি সিটার মডেল অনুযায়ী বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার যদি সামান্যতমও বেশি বা কম হতো, তবে নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি তৈরি হতে পারত না। এই “সূক্ষ্ম-সুর” সমস্যাটি পদার্থের “সমালোচনামূলক ঘনত্ব” বা “গোল্ডিলক্স ঘনত্ব”-এর সাথে সম্পর্কিত। এই ঘনত্ব থেকে সামান্য বিচ্যুতি হলেও এমন মহাবিশ্ব তৈরি হতো যেখানে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থাকত না।

আরও একটি বড় সমস্যা দেখা দেয়। মহাকাশীয় গ্যালাক্সিগুলোর গঠন এবং তাদের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন গতি ব্যাখ্যা করার জন্য কেবল দৃশ্যমান পদার্থ যথেষ্ট ছিল না। দেখা গেল দৃশ্যমান নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সিতে থাকা মোট পদার্থ মহাবিশ্বের মোট প্রয়োজনীয় পদার্থের মাত্র ৫%।তাহলে বাকি ৯৫% পদার্থ কোথায়?

এই সমস্যার একটি আংশিক সমাধান আসে ফ্রিটজ জুইকি-র ১৯৩৩ সালের গবেষণা থেকে, যা পরে ১৯৭০-এর দশকে পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। তিনি প্রস্তাব করেন গ্যালাক্সি গুলোর বাইরে অদৃশ্য পদার্থ নামে কিছু আছে, যা কেবল মহাকর্ষের মাধ্যমে কাজ করে। এই ডার্ক ম্যাটার, যা আমরা সরাসরি দেখতে পাই না সেগুলো গ্যালাক্সিগুলোকে একসাথে ধরে রাখতে এবং তাদের ঘূর্ণন ব্যাখ্যা করতে অপরিহার্য। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিসহ প্রায় সব গ্যালাক্সিই ডার্ক ম্যাটারের এক বিশাল বলয়ে আবৃত।

কিন্তু ডার্ক ম্যাটার থাকার পরও মহাবিশ্বের প্রায় ৭০% পদার্থ তখনও রহস্যময় ছিল। এই রহস্য উন্মোচন করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যখন সুপারনোভা নামক নক্ষত্রের বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করেন। এটি ছিল “স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল”-এর একটি উন্নততর রূপ। তারা আশা করেছিলেন বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ধীরে ধীরে কমবে, যেমনটি আইনস্টাইন-ডি সিটার মডেলে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাদের বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ ছিল ভিন্ন – মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আসলে ত্বরান্বিত হচ্ছে!

এই ত্বরণ ব্যাখ্যা করার জন্য আইনস্টাইন তাঁর ১৯১৭ সালের সমীকরণে যে “মহাজাগতিক ধ্রুবক” যোগ করেছিলেন, সেটি ফিরিয়ে আনতে হয়। এই ধ্রুবকটি শূন্যস্থানকে এক ধরণের রহস্যময় শক্তি প্রদান করে, যা dark energy নামে পরিচিত। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের মোট শক্তির প্রায় ৭০%।

ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি অনেক সমস্যা সমাধান করলেও নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মাপার দুটি ভিন্ন পদ্ধতি – বিগ ব্যাং-এর প্রথম দিকের তথ্য থেকে প্রাপ্ত অনুমান এবং বিগ ব্যাং-এর পরের দিকের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত পরিমাপ একে অপরের সাথে মিলছে না। এই অমিল “হাবল টেনশন” নামে পরিচিত। এটি ইঙ্গিত দেয়, হয় আমাদের তত্ত্ব অসম্পূর্ণ, অথবা আমাদের পরিমাপে ত্রুটি আছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হল, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বিগ ব্যাং-এর কয়েকশো মিলিয়ন বছর পরের গ্যালাক্সিগুলোর ছবি পাঠাচ্ছে। তত্ত্ব অনুযায়ী, এই সময়ে গ্যালাক্সিগুলো তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকার কথা। কিন্তু ওয়েব টেলিস্কোপ সেখানে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ গঠিত গ্যালাক্সি এবং গ্যালাক্সি ক্লাস্টার দেখতে পাচ্ছে। এটি বিগ ব্যাং তত্ত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন কসমিক ইনফ্লেশন, ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির মতো ধারণাগুলোর জন্য কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।এসব ধারণা তত্ত্বের ফাঁকগুলো পূরণ করতে ব্যবহার করা হলেও, এদের মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা এখনও অন্ধকারেই আছি।

বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের উৎপত্তির এক যুগান্তকারী ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। তবে হাবল টেনশন এবং জেমস ওয়েবের নতুন পর্যবেক্ষণের মতো বিষয়গুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আমাদের মহাজাগতিক বোঝাপড়ায় এখনও অনেক ফাঁক রয়ে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন