বিআইজিডির জরিপ – ৪৮.৫০ শতাংশ ভোটার কাকে ভোট দেবেন এই প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর ‘পালস সার্ভে ৩’-এর জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, এই প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীন মানুষের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮.৫০ শতাংশ, যা গত বছরের অক্টোবরে ছিল ৩৮ শতাংশ। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তায়ও ভাটা পড়েছে। এই জরিপটি গত ১ থেকে ২০ জুলাই, ২০২৫ তারিখে দেশের ৫ হাজার ৪৮৯ জন মানুষের ওপর পরিচালিত হয়।

জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি যে তারা কাকে ভোট দেবেন। এই হার আট মাসের ব্যবধানে ১০.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ১৪.৪০ শতাংশ মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম জানাতে চাননি এবং ১.৭০ শতাংশ মানুষ ভোট না দেওয়ার কথা বলেছেন। এই বিশাল সংখ্যক সিদ্ধান্তহীন ও অনাগ্রহী ভোটার দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

জরিপে রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তার চিত্রও উঠে এসেছে। আট মাস আগে ১৬.৩০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা বললেও, বর্তমানে এই হার কমে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনও ১১.৩০ শতাংশ থেকে কমে ১০.৪০ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থন ২ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ২.৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

ক্ষমতাসীন দল (যদিও বর্তমানে নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগের সমর্থন ৮.৯০ শতাংশ থেকে কমে ৭.৩০ শতাংশ হয়েছে। অন্যান্য দল, যেমন জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য ইসলামি দলের সমর্থনও কমেছে। তবে কোন দলের প্রার্থী জিতবে বলে মনে করেন, এই প্রশ্নের উত্তরে ৩৮ শতাংশ মানুষ বিএনপির কথা বলেছেন, যা তাদের মাঠ পর্যায়ে এখনো শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ৪২ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে এগোচ্ছে, যা গত বছরের অক্টোবরের ৫৬ শতাংশের তুলনায় কম। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ কিছুটা বেড়েছে, ৪৩ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমের প্রতি জনগণের সমর্থন কিছুটা কমেছে, তাদের কাজের মূল্যায়নে গত অক্টোবরে ৬৮ শতাংশ নম্বর দিলেও এখন তা কমে ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ মানুষ ভালোভাবে সংস্কার করার পর নির্বাচন চান। ১৭ শতাংশ মানুষ কিছু জরুরি সংস্কার করে নির্বাচন চান এবং ১৪ শতাংশ মানুষ সংস্কার বাদ দিয়ে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোর মধ্যে ৩০ শতাংশ মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ১৬ শতাংশ আইন ও বিচার ব্যবস্থার উন্নতি এবং ১৭ শতাংশ দুর্নীতি দমনের কথা বলেছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে ৩২ শতাংশ মানুষ ফেব্রুয়ারী নয়, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চান।

বিআইজিডির এই জরিপ থেকে স্পষ্ট যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। সিদ্ধান্তহীনতার হার বৃদ্ধি এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন হ্রাস প্রমাণ করে ভোটাররা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্ক বার্তা। জনগণের আস্থা ও সমর্থন পুনরুদ্ধারে দলগুলোকে তাদের কৌশল ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন