বেশ ক’বছর আগে কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার খরচ করে হিউম্যান জিনোম নিয়ে গবেষনা সম্পন্ন হয়। তারও কয়েক দশক পর বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মানব জিনোম অ্যানালিসিস সহজলভ্য হয়ে মাত্র কয়েক শ’ ডলারে নেমে আসে। আমিও উৎসাহে নেমে পড়ি।23andme.com এ মুখের লালা পাঠিয়ে নিজের জিনোম অ্যানালিসিস করতে পাঠাই। এতে আমার মা এবং বাবার অংশের ভিন্ন ভিন্ন মাইগ্রেশন প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে – যা এই বাংলার জনগোষ্ঠীর জ্বিনগত গঠনের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। এর আগে ইথিওপিয়া নিয়ে পোস্টিং এ লিখেছিলাম আফ্রিকা মহাদেশের বাইরের অধিকাংশ মানুষের জ্বিনপুল ঐ এলাকার ছোট্ট একটি জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে।
আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স এর দুইবার মাইগ্রেশন হয়।
প্রথমবার প্রায় ১১০,০০০ বছর আগে, যেটা ইসরাইলে এসে শেষ হয়ে যায়। ৭৫,০০০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার তোরাবোেরা আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাতের ফলে পুরো বিশ্ব কয়েক শতাব্দী অন্ধকারে ছিল। বিশ্বের জনসংখ্যা তখন কয়েক হাজারে নেমে আসে।দ্বিতীয় মাইগ্রেশন শুরু হয় তারও পরে, ৬৫,০০০ বছর আগে। বরফ যুগ তখন চরমে। প্রায় পুরো পৃথিবীটাই সাদা বরফে ঢাকা (একে Snow-Ball Earth বলা হয়ে থাকে)। আফ্রিকার কিছু অংশ এবং নিরক্ষ রেখার আশে পাশের কিছু অংশ ছাড়া। পানি প্রায় ৩০ মিটার নেমে যাওয়ায় ভূমধ্যসাগরের অংশবিশেষ তখন শুকনো।
সেই সময়, প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে আমার মায়ের এবং বাবার, দুই দিকেই ওরা বেরিয়ে আসে। মায়ের দিকের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকা থেকে প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে বের হয়ে সরাসরি ভারতে চলে আসে। ওদের আমরা দ্রাবিড় নামে চিনে থাকি। আর বাবার দিকে? আফ্রিকা থেকে বের হয়ে, ইউরোেপ-সাইবেরিয়া ঘুরে প্রায় ৬,০০০ বছর আগে আফগানিস্তানের ফাঁক গলে এই এলাকায় প্রবেশ করে।এদের আমরা আর্য বলে চিনে থাকি। বাংলায় আসার পথে পূর্ব এশিয়ার সাথেও কিছুটা মিলমিশ হয়। এই হচ্ছে বাঙালী। কানাডায় থাকার সময়, যদি বুঝতে পারতাম না কেউ একজন কোথাকার – তবে ধরে নিতাম সে বাংলাদেশের। অধিকাংশ সময়েই মিলে যেত।
আমাদের জিনগত গঠন ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক অবস্থানের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। আমাদের মধ্যে পশ্চিম ইউরেশীয় এবং পূর্ব ইউরেশীয় প্রভাব রয়েছে। পশ্চিম ইউরেশীয় অংশটি ইরানীয় মালভূমি এবং মেসোলিথিক শিকারী-সংগ্রাহকদের সাথে সম্পর্কিত এবং পূর্ব ইউরেশীয় প্রভাবটি তিব্বতি-বর্মী এবং খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত। বাংলার ইতিহাসে অনেকবার অনেক জাতির মাইগ্রেশন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটেছে। প্রাচীন কালে সিন্ধু সভ্যতা এবং পশ্চিমের স্টেপ হোর্ডারদের প্রভাব বাংলায় প্রবেশ করে (আমার বাবার দিককার)।
জেনেটিক মিক্স এবং এর ফলাফল
ক্রমাগত ইমিগ্রেশনের ফলে এই অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক মিক্সিং হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জেনেটিক ভেরিয়েশনের সমন্বয় ঘটেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই জ্বিনগত দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করেছে। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব ইউরেশীয় এবং পশ্চিম ইউরেশীয় জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে বাংলার জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া তিব্বতি-বর্মী এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীর সাথে মিশ্রণের ফলে বাংলার জনগণের জিনগত বৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। এই মিশ্রণ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র জিনগত দুর্বলতাগুলি প্রশমিত করেনি বরং বাংলার জনগণের শারীরিক এবং জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে আরও উন্নত করেছে। এটি বাংলার সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের উপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আমরা কেন ভারতীয় উপমহাদেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন?
শুধুমাত্র আদি বাংলার মানুষের মধ্যে পুর্ব এশীয় জ্বিনগত প্রভাব ১০% বা তারও বেশী বলে ধারনা করা হয় – যা ভারতের অন্য কোন জনগোষ্ঠির মধ্যে নেই। এর দুইটি কারন প্রাচীনকালে তিব্বতি-বর্মী এবং অন্যান্য পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেশনের ফলে এই জ্বিনগত প্রভাব বাংলার জনগোষ্ঠীতে প্রবেশ করেছে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সাংস্কৃতিক এবং জিনগত বিনিময়কে সহজ করেছে।
২০০২ সালে কানাডার ইমিগ্রেশনের অ্যাাপ্লাই করার সময় জানতে পারলাম আমার ছোট মেয়ের থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট আছে। মনে করলাম মা’র থেকে পেয়েছে। তারও প্রায় ১৫ বছর পরে আমার বাইপাস সার্জারীর সময় জানা গেল – আমিই ক্যারিয়ার। এখন এই থ্যালাসেমিয়া ট্রেইটের একটা হিস্ট্রি আছে। এই বদ্বীপ অঞ্চলে প্রতি বছরই বন্যা হোত। মশা এবং ম্যালেরিয়া, এবং ম্যালেরিয়ায় মহামারী নিত্য ঘটনা। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনোমে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্লুকোজ-৬-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেস (G6PD) এর অভাব ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।
ভিব্রিও কলেরা বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনোমে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। কলেরা রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনগত অভিযোজন ঘটেছে। কলেরা প্রাদুর্ভাবের সময় বাংলার জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য এবং অভিযোজন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রক্তের গ্রুপ “ও” ব্যাক্তিরা কলেরা র প্রতি অন্য গ্রুপ গুলোর চাইতে অতি মাত্রায় সংবেদনশীল। ততোটা “এ”, “বি” এবং “এবি” গ্রুপের ব্যাক্তিরা নয়। রক্তের গ্রুপ “ও” -এর ব্যক্তিদের অন্ত্রের কোষে ভিব্রিও কলেরা ব্যাকটেরিয়ার টক্সিন বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করে, যার ফলে তারা কলেরার সংক্রমণে বেশি গুরুতর অসুস্থ হতে পারেন। পৃথিবীতে একমাত্র প্রাচীন বাংলা এবং পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে “A”. “B” – এই দুইটি গ্রুপের আবির্ভাব ও আধিক্য লক্ষ্যনীয়।
সব কথার শেষ কথা – প্রাচীন বাংলার জনগোষ্ঠী অর্থাৎ এই আমরা – আসলেই ইউনিক। হাজার হাজার বছরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাইগ্রেশন যেমন ইন্দো-আর্য্য, তিব্বতি-বর্মী, এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক, এবং এর সংগে ভৌগলিক বাস্তবতা, গত কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয় সংস্কৃতি মিলে এই অনন্য বাঙালী জাতিগোষ্ঠী তৈরী করেছে। শুভ নববর্ষ।


