… চীনে অবস্থানকালে প্রধান উপদেষ্টা চীনা কোম্পানির মাধ্যমেই তিস্তাবিষয়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, চীনের পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি চীনের কাছে বাংলাদেশের নদ-নদীবিষয়ক ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার জন্য বিদেশি সরকার কিংবা সংস্থা দ্বারা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের অতীত অভিজ্ঞতা তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। … পঞ্চাশের দশকে ক্রুগ কমিশনের সুপারিশক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (আইইসিও) বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৬৪ সালে দুই খণ্ডের মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করে।
… নদ-নদীর প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে আইইসিও যে পন্থার প্রচলন করে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় ‘বাণিজ্যিক পন্থা’। বদ্বীপের জন্য এর সুনির্দিষ্ট রূপ হলো ‘বেষ্টনী পন্থা’। এই পন্থার মূল লক্ষ্য হলো, প্লাবনভূমিকে নদীখাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। সেই লক্ষ্যে সারা দেশে অসংখ্য বেড়িবাঁধ, সুইসগেটসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। … খালি চোখেও আইইসিওর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলাফল স্পষ্ট; দেশের নদী ব্যবস্থা বিপর্যন্ত। অসংখ্য নদী হারিয়ে গেছে, বাকিগুলোও মুমূর্ষু। একদিকে নদীখাতগুলো ভরাট করা হয়েছে, অন্যদিকে প্লাবন ভূমির অবক্ষয় সাধিত হয়েছে। … এখন যেমন আমরা নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চীনের প্রতি আকর্ষিত হচ্ছি, আগে আকর্ষণ ছিল নেদারল্যান্ডসের প্রতি।
…বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার মূল করণীয় হলো, প্রবাহের ঋতুভেদ মোকাবিলা এবং পলিবালুর সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা।নেদারল্যান্ডসের জন্য এই দুই করণীয়র একটিও প্রাসঙ্গিক নয়। … নেদারল্যান্ডসের মতো চীনের নদ-নদীর পরিস্থিতিও বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। নদ-নদীর প্রতি চীন অত্যন্ত আগ্রাসী বাণিজ্যিক পন্থা অনুসরণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তার পরিণতি ভালো হয়নি। এ নিয়ে সেই দেশে সমালোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
বাংলাদেশের তিস্তা নদীর জন্য পাওয়ার চায়না যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তাতেও আমরা আগ্রাসী বাণিজ্যিক পন্থার প্রতিফলন দেখি। এই পরিকল্পনায় তিস্তার মতো একটি বেনুনী নদীর গড় প্রন্থ একলাফে আনুমানিক ৩ হাজার মিটার থেকে ৮১৬ মিটারে হ্রাসের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার স্থায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ। … সব মিলিয়ে বলতে হচ্ছে যে, বাংলাদেশের নদ-নদীর পরিস্থিতি ভিন্ন। সে জন্য প্রয়োজন ভিন্ন দর্শন ও পন্থা। বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হলো, নদ-নদীর প্রতি প্রকৃতিসম্মত ও উন্মুক্ত পন্থা এবং দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে পাড় স্থিতিশীলকরণ।
অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, বিদেশিদের পক্ষে বাংলাদেশের এই বিশেষ পরিস্থিতি ও প্রয়োজন হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। বস্তুত, অতীতে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিস্তাবিষয়ক পাওয়ার চায়না প্রণীত প্রকল্প ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের নদ-নদী ব্যবস্থাপনায় আবার কোনো বিদেশি কোম্পানিনির্ভর প্রয়াস যে সফল হবে, সে বিষয়ে আশাবাদী হওয়া কঠিন।


