“ফিনিশীয়” নামে কি কোনো জাতিসত্তা কখনো ছিল?

প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় সভ্যতার ইতিহাসে ফিনিশীয়দের (Phoenicians) নাম এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তারা ছিলেন দুঃসাহসী নাবিক, কুশলী বণিক এবং বর্ণমালার উদ্ভাবক, যা আধুনিক পশ্চিমা বর্ণমালার ভিত্তি স্থাপন করেছে। কিন্তু “ফিনিশীয়” বলে কি কোনো জাতিসত্তা কখনো ছিল? বর্তমান লেবাননের উপকূলে অবস্থিত স্বাধীন নগর-রাষ্ট্রগুলোর এই বাসিন্দারা নিজেদেরকে কখনো এই নামে ডাকত না। তারা নিজেদের পরিচয় দিত তাদের শহরের ভিত্তিতে টাইর, সিডন, গেবাল, বেরিতুস, কিংবা আরাডুস নামে। প্রতিটি শহর ছিল স্বতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসিত। তাদের ভাষা একই পরিবারের হলেও ভিন্ন ভিন্ন উপভাষা, আলাদা দেবদেবীর পূজা, নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক নীতি ছিল। আমরা যাদেরকে একত্রে “ফিনিশীয়” বলি, তারা আসলে ছিলো কিছু বিচ্ছিন্ন নগররাষ্ট্রের অধিবাসী।

“ফিনিশীয়” (Phoinikè) শব্দটি কোনো স্ব-প্রদত্ত নাম নয়, এটি গ্রিকদের দেওয়া একটি উপাধি। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে সপ্তম শতকের হোমারীয় কবিতায় এই নামটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। এই নামের উৎস এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। “ফোইনিকে” শব্দের অর্থ “লালচে বেগুনি”। এটি হয়তো ফিনিশীয়দের গাত্রবর্ণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছিল, অথবা সম্ভবত, তারা যে মূল্যবান বেগুনি রঙের রঞ্জক তৈরি ও বাণিজ্য করত সে কারণে এই নামকরণ করা হয়েছিল। এই রঙ ছিল তাদের সমৃদ্ধির প্রতীক।

ফিনিশীয়দের পরিচয় একক জাতি হিসেবে না হয়ে বরং তাদের স্বতন্ত্র নগর-রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ছিল। প্রতিটি নগরীর নিজস্ব উপভাষা, নিজস্ব দেব-দেবীর গোষ্ঠী, স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক নীতি ছিল। তাদের মধ্যে কোনো একীভূত রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সত্তা ছিল না। গ্রিকরা যখন এই বিভিন্ন নগরীর মানুষের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনৈতিক সম্পর্কে জড়ায়, তখন তারা এই পুরো অঞ্চলটিকে এবং তার অধিবাসীদের একটি সাধারণ নামে চিহ্নিত করতে শুরু করে, আর তা-ই হলো “ফিনিশীয়”।

ফিনিশীয়দেরকে একটি একক জাতিসত্তা হিসেবে ধরে নেওয়ার ভুল ধারণা থেকে তাদের উৎপত্তিস্থল নিয়েও বিভিন্ন প্রাচীন লেখক ও ধর্মীয় গ্রন্থে নানা ধরনের তত্ত্ব তৈরি হয়েছিল। এই তত্ত্বগুলো মূলত ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, তাদের প্রকৃত ইতিহাস তখনো অজানা ছিল।

বাইবেলের বুক অফ জেনেসিস-এ ফিনিশীয়দেরকে সিডনের বংশধর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি ছিলেন কানানের পুত্র এবং হামের নাতি। এর মাধ্যমে বাইবেলের লেখকরা ফিনিশীয়দেরকে মানবজাতির বংশলতিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। বাইবেল অনুসারে, নূহের তিন পুত্র শেম, হাম এবং ইয়াফেত ছিলেন যথাক্রমে সেমিটিক, আফ্রিকান এবং মধ্য ও পূর্ব এশিয়ার মানুষের পূর্বপুরুষ। অদ্ভুতভাবে ফিনিশীয়রা যারা বাইবেল লেখকদের মতোই সেমিটিক ভাষা বলত তাদেরকে শেমের পরিবর্তে হামের বংশধর হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

গ্রিক ও রোমান লেখকরা ফিনিশীয়দের উদ্ভব নিয়ে নানা অনুমান করেছিলেন। হেরোডোটাসের মতে, তারা আফ্রিকার হর্ন ও আরব উপদ্বীপের মধ্যবর্তী অঞ্চল ইরিথ্রিয়ান সাগর থেকে এসেছিল। স্ট্র্যাবো এবং প্লিনি দ্য এল্ডারের মতো লেখকরা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে তাদের আদি নিবাস বলে মনে করতেন। জাস্টিন নামে একজন রোমান লেখক উল্লেখ করেন যে, ফিনিশীয়রা তাদের আদি দেশে একটি ভূমিকম্পের কারণে লেভান্ট অঞ্চলে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল। তবে তিনি এই ভূমিকম্পের স্থান বা সময় সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি। এই সমস্ত তত্ত্ব ছিল অনুমানভিত্তিক যার কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না।

প্রাচীন মিশরের নথি থেকে ফিনিশীয়দের সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৩ শতকে ফারাও দ্বিতীয় রামসেসের রাজত্বকালে রচিত একটি ব্যঙ্গাত্মক প্যাপিরাস নামে পরিচিত প্যাপিরাস আনাস্তাসি, মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যানানীয় উপকূলের শহরগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়। এটি একজন মিশরীয় লিপিকরের লেখা একটি চিঠি হিসেবে লেখা হলেও, এটি সম্ভবত একটি সাহিত্যিক রচনা ছিল। এই নথিতে বাইবলস, বেরিটাস, সিডন, সারেপটা এবং টাইর-এর মতো শহরগুলোর বর্ণনা রয়েছে।

এই লেখা থেকে বোঝা যায় এমনকি ফিনিশীয়দের স্বর্ণযুগের বহু শতাব্দী আগেই মিশরীয় প্রশাসকরা এই অঞ্চলের শহরগুলোর রাস্তাঘাট, বিন্যাস এবং ঐশ্বর্য সম্পর্কে সচেতন ছিল। প্যাপিরাসে টাইর সম্পর্কে বলা হয়েছে, “সমুদ্রের মধ্যে আরেকটি শহরের কথা তারা বলে, টাইর-বন্দর তার নাম। সেখানে নৌকা করে জল নিয়ে যেতে হয়, আর সেটি বালির চেয়ে মাছের জন্য বেশি সমৃদ্ধ।” এই বিবরণ থেকে বোঝা যায় এ শহরগুলো সেই সময় থেকেই সমৃদ্ধ ছিল এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল।

আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায় প্রাচীন লেখকদের সমস্ত অনুমান ও তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেছে। বাইবেল ও গ্রেকো-রোমান লেখকরা তাদের অজ্ঞতার কারণে ফিনিশীয়দের উৎপত্তি নিয়ে কেবল অনুমানই করতে পারতেন। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো তাদের প্রকৃত ইতিহাসকে উন্মোচন করছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে ফিনিশীয়রা আসলে বাইরে থেকে আসা কোনো নতুন জাতি ছিল না, বরং তারা ক্যানানীয় সংস্কৃতির সরাসরি উত্তরসূরি ছিল।ক্যানানীয়রা খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে লেভান্ট উপকূলে বসবাস করত। ফিনিশীয়দের ভাষা ছিল ক্যানানীয় ভাষারই একটি উপভাষা এবং তাদের ধর্ম, শিল্পকলা ও বাণিজ্য কৌশলগুলো ক্যানানীয় সংস্কৃতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।

যে মানুষগুলো পরবর্তীতে “ফিনিশীয়” নামে পরিচিতি লাভ করে, তাদের অস্তিত্ব বহু শতাব্দী ধরেই ছিল, কিন্তু তাদের পরিচয় ছিল ক্যানানীয় হিসেবে।ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে ক্যানানীয় নগর-রাষ্ট্রগুলোর পতনের পর কিছু ক্যানানীয় নগর-রাষ্ট্র যেমন টাইর, সিডন, বাইবলস, এবং বৈরুত টিকে ছিল, তারা ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে তাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে। এই শহরগুলোর বাসিন্দারাই পরবর্তীতে গ্রিকদের কাছে “ফিনিশীয়” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ফিনিশীয়দের ইতিহাস কেবল একটি নামের রহস্য নয়, এটি জাতিসত্তা, সংস্কৃতি এবং উত্তরাধিকারের এক জটিল বিশ্লেষণ। “ফিনিশীয়” কোনো একক জাতির নাম ছিল না, এটি একটি ভুল ধারণা থেকে উদ্ভূত গ্রিকদের দেওয়া একটি সাধারণ পরিচয়। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো প্রমাণ করেছে এই জনগোষ্ঠী বাইরের কোনো স্থান থেকে আসেনি, বরং তারা ছিল প্রাচীন ক্যানানীয় সংস্কৃতিরই সরাসরি উত্তরাধিকার। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা, ধর্ম ও বাণিজ্য কৌশলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল এবং ভূমধ্যসাগরের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন