ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করা এবং দেশটির সামরিক ক্ষমতাকে ধ্বংস করা। বেশ কয়েকটি বিকল্প আছে, যেভাবে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শেষ হতে পারে।
প্রথমত, ইরান ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি বড় আকারের সামরিক হামলা চালাবে। এরপর নিজ জনগণের কাছে দাবি করবে যে তারা পাল্টা জবাব দিয়েছে এবং ইসরায়েলিদের ক্ষতি করেছে। এরপর দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যুদ্ধবিরতির চেষ্টায় তারা সম্মতি দেবে। সংক্ষেপে, এটি হবে মুখ বাঁচানোর লক্ষ্যে ‘একটি কৌশলগত আত্মসমর্পণ’।
মূলত, লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের অভিযানের পর একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইসরায়েলের বর্তমান ইরান হামলা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ—সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা এবং অসংখ্য গুপ্তহত্যার মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া। এই বিষয়টি ইরানের নিরাপত্তা পরিষেবায় ইসরায়েলের গভীর অনুপ্রবেশের প্রমাণ দেয়।
ইসরায়েলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চালানো বিধ্বংসী হামলা ইরানের নেতৃত্বকে বিশৃঙ্খল করে দিতে পারে। ইসরায়েল সম্ভবত নতুন কমান্ডার এবং তাদের স্থলাভিষিক্তদের ওপরও হামলা চালাবে।
ইরান অবশ্যই যুদ্ধের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে চায় না, কিন্তু তারা হয়তো ক্রমাগত হামলা সহ্য না করে ভবিষ্যতের জন্য টিকে থাকার পথ বেছে নেবে।দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, ইরান টিকে থাকবে এবং ইসরায়েলের ওপর কিছু আঘাত হানবে। এটি প্রক্সি গোষ্ঠী ব্যবহার করে গেরিলা কৌশলে আঘাত হানা, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ভেদ করে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা বা অন্য কোনো উপায়েও হতে পারে। ইরানের নাতাঞ্জ ও অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান তুলনামূলকভাবে দ্রুত তা মেরামত করতে পারবে।
একই সময়ে, ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকবে। যদি ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর সত্যিকারের চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে ইসরায়েল তাদের অভিযান সংক্ষিপ্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি আলোচনার চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। ট্রাম্প হামলার পর ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ধরনের আলোচনা তেহরানের জন্য আকর্ষণীয়—দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং নিষেধাজ্ঞা কমানোর প্রতিশ্রুতি তাদের কাছে লোভনীয়।
তবে ইসরায়েলি হামলার মুখে এটি রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন। ট্রাম্প যেকোনো ছাড়কে নিজের বিজয় বলে ঘোষণা করবেন এবং ইরানকে চাপের মুখে নতি স্বীকার করা হয়েছে বলে মনে হবে।
তবে এমন ইতিবাচক পরিস্থিতির বিপরীতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিও সম্ভব এবং সম্ভবত এটিই ঘটার আশঙ্কা বেশি। বিপর্যয়কর পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে একটি হলো ইরান-ইসরায়েল সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
যদি তেহরান আলোচনাকে আড়াল হিসেবে দেখে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলো ইরানের ‘প্রতিশোধমূলক’ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রও নিজ কারণে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করতে পারেন, ইসরায়েল হামলার মাধ্যমে অর্ধেক কাজ করে ফেলেছে এবং এখন যুক্তরাষ্ট্র বাকি কাজ শেষ করতে পারে। আর তারা ইরানের ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্রে ভারী বাংকার বাস্টার দিয়ে হামলা চালাতে পারে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ঘোরতর।
একটি চূড়ান্ত সম্ভাবনা হলো, যুদ্ধ কখনোই শেষ হবে না। অন্তত আনুষ্ঠানিক অর্থে নয়। যদিও ইসরায়েলের বিশাল আকারের হামলার ঢেউ হয়তো একসময় থামবে, কিন্তু নীচু মাত্রার সংঘাত আরও কয়েক মাস ধরে চলতে পারে।
ইসরায়েল হয়তো মাঝেমধ্যে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলা চালাবে, পাশাপাশি ইরানে গুপ্তহত্যা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালাবে। ইরানও মাঝেমধ্যে ইসরায়েলের দিকে হামলা চালাবে, সঙ্গে অন্যান্য উপায়েও পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করবে।
ক্রমাগত পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে, ইরান হয়তো পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ছাড়াই গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি তৈরি করতে পারে এবং ইসরায়েলি হামলাকে এর ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
আবার, বিভিন্ন সম্ভাবনার সমন্বয়ও সম্ভব। মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি একটি বৃহত্তর পারমাণবিক চুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে। ইরান হয়তো স্বল্প মেয়াদে ছাড় দেবে, কিন্তু বিশ্বাস করবে যে—প্রতিশোধ ঠান্ডা মাথায় নিতে হয় এবং আগামী মাসগুলোতে প্রক্সি হামলা চালাবে এবং প্রতিশোধের একটি রূপ হবে এটি। এভাবেই এটি একটি চিরস্থায়ী পাল্টাপাল্টি হামলার যুদ্ধে পরিণত হবে।


