সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত ফেনী ঘুরে সমকাল প্রতিবেদক – স্মরণকালের ভয়াবহ বানে ফেনীর লাখ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন । ফুলগাজী , পরশুরাম , ছাগলনাইয়া ও সদর উপজেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা ডুবে গেছে । যতদূর চোখ যায় বসতভিটার কোনো অস্তিত্ব নেই । ধু-ধু জলের প্রান্তরে প্রাণে বাঁচতে কেউ টিনের চালে , গাছে কিংবা ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন । সড়ক যোগাযোগ বন্ধ , নেই বিদ্যুৎ সংযোগ । মোবাইল নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন। আটকে পড়াদের উদ্ধারে যাবে , সে উপায় হাতে নেই স্বজনের । পানির তোড়ে সেসব এলাকায় যাওয়া ঝুঁকির , মিলছে না উপযুক্ত বাহন । বাঁচা-মরার খবর পাওয়াও এখন দুষ্কর । কয়েক লাখ মানুষ স্থানীয় স্কুল-কলেজ , মসজিদ , মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছেন । খাবার ও পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে ।
১১টি জেলা বন্যাকবলিত – ফেনী , কুমিল্লা , নোয়াখালী , লক্ষ্মীপুর , ব্রাহ্মণবাড়িয়া , চট্টগ্রাম , কক্সবাজার , খাগড়াছড়ি , সিলেট , মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ । বন্যাকবলিত রাঙামাটি জেলায় পানি কমতে শুরু করেছে । এসব জেলায় প্রায় ৯ লাখ পরিবার পানিবন্দী। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। বন্যায় তিন দিনে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বুধবার থেকে কার্যত অচল। শুধু ত্রাণবাহী যানবাহন থেমে থেমে চলাচল করছে।
দুর্গত মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন দেশের ছাত্র-জনতা। যে যেভাবে পারছেন-অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, উদ্ধার, আশ্রয়, শুশ্রূষা দিয়ে, কায়িক শ্রম দিয়ে ত্রাণকাজে সহায়তা করছেন। রাজধানীসহ সারা দেশে পথে পথে দেখা যাচ্ছে ত্রাণ সংগ্রহের কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচিতে মানুষের ঢল নেমেছে।
ফেসবুক ভরা এখন ত্রাণকাজের ছবি, ভিডিও আর এ-সংক্রান্ত হরেক রকম আবেদনে। বিভিন্ন গ্রুপ, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও মানুষ এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাঁদের আহ্বান, অনুরোধ, অভিমত, অভিজ্ঞতা।
ফারদিন হাসান নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন – পুরা ফেসবুক ওয়ালে খেলা নিয়ে একটা পোস্টও দেখলাম না। সবার চিন্তা কেবল বন্যা ও ভারতের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে। আমার দেশটা আসলেই বদলে গেছে, আমার দেশের মানুষ দেশ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে! এই দেশ আর যা-ই হোক, বিপথে যাবে না।
দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী আকস্মিক বন্যার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন –
পশ্চিম দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা লঘুচাপ আর শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু–এই তিন মিলে বিপুল পরিমাণ মেঘ ফেনী-নোয়াখালী-ত্রিপুরার আকাশে স্তরে স্তরে জমা হয়। ১৯ আগস্ট সকালে তা বিস্ফোরিত হয়ে জনপদে নেমে আসে। আবহাওয়াবিদেরা এটাকে বলছেন মেঘ বিস্ফোরণ বা ‘ক্লাউড ব্লাস্ট’ যা বিস্তৃত ছিল ভারতের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লা-ফেনী পর্যন্ত ৫০-৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান হবিগঞ্জে পরিদর্শন কালে সাংবাদিকদের সাথে আলাপে বলেছেন —
…এবারের বিষয় থেকে শিক্ষা নিয়ে যত অভিন্ন নদী রয়েছে, সেগুলোর সব কটির ব্যাপারেই পানি ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন দেখা দিলে যাতে আগাম সতর্কতা বাংলাদেশকে জানানো হয়, সেই বার্তা ভারতে দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ভারতীয় দূতাবাসকে বিষয়টি জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে যাতে এমন অবস্থা না হয়, এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।


