জাপানের শিকোকু দ্বীপের একটি নির্জন পাহাড়ি গ্রাম নাগোরো (Nagoro)। দেখতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে বসে থাকা কিংবা হেঁটে চলা কিছু মানুষ। কারও মাথায় টুপি, কেউ হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে, কেউবা চাষের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায়, তারা কেউ মানুষ নয়, সবাই পুতুল। বাস্তবিকই নাগোরো সেই অদ্ভুত গ্রাম, যেখানে পুতুলেরা বসবাস করে মানুষের জায়গায় এবং মৃতদের কিংবা স্থানত্যাগকারীদের স্মৃতিকে বহন করে নিয়ে চলে। এ যেন এক “মৃত-জীবিত” সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অস্তিত্ব ও অনুপস্থিতির মাঝের সীমারেখাটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
নাগোরো গ্রামটি একসময় প্রায় ৩০০ জন অধিবাসীর একটি ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম ছিল। তবে বিগত কয়েক দশকে জাপানে ‘জনসংখ্যা হ্রাস ও নগরমুখী অভিবাসন’ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই গ্রাম জনশূন্য হতে শুরু করে। অধিকাংশ মানুষ কাজের খোঁজে শহরে চলে যায় বা মৃত্যুবরণ করে। বাকি থাকে শুধু পরিত্যক্ত ঘর, শুনশান রাস্তা এবং নিঃসঙ্গ পাহাড়ি নিস্তব্ধতা।
২০০৩ সালে এই পরিবর্তনের এক শৈল্পিক জবাব তৈরি করেন আয়ানো সুকিমি (Ayano Tsukimi) নামের এক নারী, যিনি শহর থেকে ফিরে নিজের গ্রামের এই শূন্যতা উপলব্ধি করে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। তিনি তার বাবার স্মরণে একটি মানবাকৃতির পুতুল তৈরি করেন। এর পর থেকেই শুরু হয় “পুতুল বসানোর আন্দোলন”। নাগোরো গ্রামে ৩৫০+ এর বেশি পুতুল রয়েছে, যা জীবিত মানুষদের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি।
এই পুতুলগুলো নিছক সৌন্দর্য নয়। প্রত্যেকটি একটি স্মৃতি, একটি জীবন, একটি সামাজিক চিহ্ন বহন করে। কেউ গ্রামের পুরাতন ডাক্তার, কেউ কৃষক, কেউ স্কুলের ছাত্র। পুতুলদের এই পুনর্বিন্যাস গ্রামটিকে নতুনভাবে ‘জীবন্ত’ করে তুলেছে, যদিও তারা কোনো কথা বলে না, সরে না। এই দৃশ্য সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বে “প্রতিস্থাপনীয় শোকপ্রক্রিয়া” নামে পরিচিত। যেখানে মানুষ তার হারানো আত্মীয় বা সমাজের কোনো সদস্যের শূন্যতা পূরণে বস্তুগত বা সাংস্কৃতিক প্রতীক তৈরি করে। নাগোরো এই শোকপ্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী ও জনসম্মুখ শিল্পে রূপ দিয়েছে।
নাগোরোর গ্রামটি একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর জাপানের কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে, আবার অন্যদিকে এটি একধরনের “সাংস্কৃতিক স্মৃতির সংগ্রহশালা”।প্রতিটি পুতুল যেন হারিয়ে যাওয়া একেকটি আত্মার নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি। এখানে “উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে পড়া” মানুষের অস্তিত্ব অদ্ভুত এক শিল্পরূপে রূপান্তরিত হয়েছে।
এই পুতুলগুলোকে “স্ট্যাচু” বলাও ভুল হবে। এগুলো একটি চলমান নাট্যরূপ। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-পুতুলেরা শিক্ষককে ঘিরে বসে আছে, মাঠে কৃষক-পুতুল ফসল তুলছে, একজন মহিলা পুতুল বাসস্ট্যান্ডে কারো অপেক্ষায় বসে আছে। প্রতিটি অবস্থান বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিকৃতি। কেউ আসে না তবু এই নাটক প্রতিদিন চলে। এই নির্মাণকে কেউ কেউ বলেন “জীবন্ত ইনস্টলেশন আর্ট”।
নাগোরো এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। শত শত পর্যটক বছরে সেখানে গিয়ে পুতুলদের দেখে মুগ্ধ হয় এবং ছবি তোলে। এই ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রভাবে হলেও নতুন প্রাণ আনছে।
নাগোরো কেবল একটি পরিত্যক্ত গ্রাম নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রশ্নচিহ্ন—”একটি সমাজ কখন মৃত বলে ধরা হয়?” যদি সেখানে কেউ না থাকে, তবুও যদি স্মৃতি, চিহ্ন ও প্রতীক বেঁচে থাকে, তবে কি তা সমাজ নয়? নাগোরোর প্রতিটি পুতুল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কেবল জীবিত থাকলেই সমাজ গড়ে না—সমাজ গড়ে স্মৃতি, সম্পর্ক, এবং তাদের প্রতিকৃতি দিয়ে। মানুষহীন এই গ্রামে পুতুলেরা সেই মানবিক সমাজেরই এক প্রেতপ্রতিচ্ছবি, যারা হারিয়ে গেছে কিন্তু মুছে যায়নি।


