বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে কার্যকর ও টেকসই নীতিমালা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তবে এই নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শুধু জনসংখ্যার দিক থেকে নয়, জ্বালানি ব্যবহারকারী হিসেবেও নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। বৈশ্বিক পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে; বিশ্বে এ খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৩২ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে লিঙ্গ বৈষম্য এখনও বিদ্যমান।
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যে পৌঁছাতে নারীর ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণ অপরিহার্য। সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৃত জ্বালানি এবং দেশের সৌরবিদ্যুতের সূচনা নারীদের হাত ধরে হয়েছে। তাই নারীদের বাদ দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ভুগছে। এই সংকট মোকাবেলায় টেকসই জ্বালানির বিকল্প ছাড়া উপায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি, অন্যথায় ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি বাড়বে। দেশের বিদ্যুতের প্রায় ৫৬ শতাংশ ব্যবহার হয় আবাসিক খাতে, যেখানে ৭০ শতাংশ ব্যবহারকারী নারী। তবুও জ্বালানি নীতি, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রাখে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এটি বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।এজন্য কর্মসংস্থান রক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারকে একীভূত করে সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে হবে। সরকার, বেসরকারি খাত ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌর প্যানেল ইনস্টলেশন, বায়ু টারবাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সঞ্চয় প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য মজুরি ভর্তুকি, পেনশন নিরাপত্তা ও চাকরি পুনর্বিন্যাস কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। ট্যাক্স ছাড় ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি উৎসাহিত করতে হবে।
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা উচ্চাভিলাষী হলেও দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে (স্টেম) নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া জ্বালানি রূপান্তর সফল হবে না। লিঙ্গভিত্তিক জোট গঠন করে নারী সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।
অর্থনৈতিক বিনিয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে। দেশের জ্বালানি খাতকে স্বনির্ভর করতে হলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই জ্বালানি খাত গড়ে তোলা অসম্ভব। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে দেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফল রূপান্তরের জন্য নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য। তবেই বাংলাদেশ টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে।


