এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনার শিকার যাদের বয়স জানা গেছে, তাদের মধ্যে ৮৭.৫৬% ছিল শিশু—অর্থাৎ শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর সর্বশেষ এই পরিসংখ্যান অনুসারে, ভুক্তভোগীদের ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই শিশু।
এই সময়ে মোট ৩৪২টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ২০১ জন ভুক্তভোগীর বয়স জানা গেছে। এদের মধ্যে ১৭৬ জনই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক: ৪০ জনের বয়স শূন্য থেকে ৬ বছর, ৬৫ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছর, এবং ৭১ জনের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। আসক ১৯৭৪ ও ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুসারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কাউকে শিশু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। “শূন্য বছর” বলতে এক বছরের নিচে বয়স বোঝায়।
গ্যাং রেপ বা দলবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। মোট ৮৪টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ৩২ জন ভুক্তভোগীর বয়স জানা গেছে—তাদের মধ্যে ২০ জনই শিশু, যাদের মধ্যে একজনের বয়স ৬ বছরের নিচে। ধর্ষণের চেষ্টার ক্ষেত্রেও শিশুরাই প্রধান শিকার। ৮৫টি ঘটনার মধ্যে ৭৮ জন ভুক্তভোগী ছিল শিশু—যার মধ্যে ২৫ জনের বয়স ৭ বছরের নিচে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মাসিক মিডিয়া পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসে ৩৮৯টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যার মধ্যে ৭২% ভুক্তভোগীর বয়স শূন্য থেকে ১৮ বছর।
একইভাবে, ৯১টি গ্যাং রেপের ঘটনার মধ্যে ৫১টি—অর্থাৎ ৫৬%—শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যায় ঢাকা শীর্ষে রয়েছে (৪৫টি), এরপর গাজীপুর (২০টি) এবং নারায়ণগঞ্জ (১৭টি)।
ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের প্রধান ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ইসমাত জাহান জানান, শিশু ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। “আমাদের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতেও এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে।”
তিনি শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাবের কথা বলেন—ডিপ্রেশন, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), এবং আত্মহত্যার প্রবণতা। “তদন্ত ও বিচার চলাকালে শিশুরা বারবার ট্রমার সম্মুখীন হয়। তারা বিশ্বাস হারায়, সম্পর্ক তৈরি করতে সমস্যা হয়। অনেকে আত্মধ্বংসাত্মক বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ে কিশোর বয়সে।”
মার্চ মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও সেভ দ্য চিলড্রেন যৌথভাবে শিশু যৌন নির্যাতনের এই বৃদ্ধির নিন্দা জানায়। তারা সতর্ক করে যে, এই প্রবণতা সমাজের গভীর দুর্বলতাকে তুলে ধরছে এবং দেশের নৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর জনবিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনে। তদন্তের সময়সীমা ৩০ দিন থেকে কমিয়ে ১৫ দিন এবং বিচার কার্যক্রমের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে ৯০ দিনে আনা হয়। শিশু ধর্ষণের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধানও চালু করা হয়।
তবে, মানবাধিকারকর্মীরা এই জনতুষ্টিকর পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। নিজেরা করি-এর সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, “এটা শুধু আইনগত ব্যর্থতা নয়—এটা সামাজিক অবক্ষয়। পুরুষরা এখন আর মেয়েশিশুদের শিশু হিসেবেও দেখছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত এই মানসিকতা না বদলাবে, কোনো আইনই কাজ করবে না।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সরকারের অতিরিক্ত কঠোর আইনের ওপর নির্ভরতার সমালোচনা করেন। “শুধু কঠোর আইন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। বরং এতে বিপদ আরও বাড়ছে—ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে মৃত্যুদণ্ড চালুর পর থেকে। ওই আইন জনরোষ প্রশমনে তড়িঘড়ি করে পাস করা হয়েছিল। আমাদের দরকার যৌক্তিক আইন এবং সামাজিক সচেতনতা।”
তিনি আরো বলেন, “সরকারকে মূল কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে—যেমন মেয়েশিশুদের জন্য আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা চালু করা, অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এটা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়—এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।”


