দরিদ্রতার কারণে বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিভাবক সন্তানদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসাকে বেছে নিয়েছেন। দেশে বর্তমানে মূলধারার মাদ্রাসা রয়েছে দুই ধরনের—আলিয়া ও কওমি।
এর মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সাধারণত সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তাদের শিক্ষাক্রমে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সরকারি কারিকুলাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেই সঙ্গে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)।
অপরদিকে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে এবং শিক্ষাক্রমও পুরোপুরি নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি। এমনকি এ ধারার প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোনো মনিটরিং কিংবা অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।
দেশে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে ছয়টি বৃহৎসহ অল্প কিছু ছোট বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বোর্ড ধরা হয় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশকে (বেফাক)। এটির অধীনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন বছরে পরীক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ৫৫%।
বেফাকের ২০২২ সালের পরীক্ষায় মোট ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৩১ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। সেখানে চলতি বছর ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসে। সে হিসাবে তিন বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪১৫ জন। এর মধ্যে মেয়ে পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেফাকের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে এ বোর্ডের অধীনে সারা দেশে প্রায় ২৯ হাজার মাদ্রাসা রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ১৭ হাজার ৩৬২টি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবার কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
সাধারণ শিক্ষায় যদিও এর ঠিক উল্টো চিত্র, প্রতিনিয়তই কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার দিন দিনই বাড়ছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী চলে যাচ্ছে কওমি মাদ্রাসায়। ধর্মীয় চিন্তার পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী সময়ে দরিদ্রতা কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ার অন্যতম কারণ।
এসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য এ ধারাকে সরকারি নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসাটাও জরুরি বলে মনে করছেন তারা। কেননা দেশে এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা কওমি।
বেশির ভাগ কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পড়ানোর সুযোগ থাকে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোয় রয়েছে আবাসিক সুবিধাও। বড় অংশ দরিদ্র মানুষদের পক্ষে সন্তানকে সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়ানো কষ্টসাধ্য। এছাড়া শ্রমজীবী নারীদের পক্ষে কাজের পাশাপাশি সন্তানের দেখভালও কষ্টসাধ্য। ফলে তারা সন্তানের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকেই বেছে নিচ্ছেন।
এছাড়া শিক্ষা কারিকুলামে বারবার পরিবর্তন, দীর্ঘ করোনাকালে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ—এমন আরো বেশকিছু বিষয়ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
কওমি মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসার আলোকে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে কোরআন-হাদিসের মূল ধারার শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। আর কওমি ধারায় সর্বোচ্চ পরীক্ষা ‘দাওরায়ে হাদিস’। যদিও এ স্তরে ওঠার আগেই শিক্ষাজীবন শেষ করেন শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ। আওয়ামী লীগ সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ব্যানবেইস সর্বশেষ ২০১৫ সালে কওমি মাদ্রাসায় একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাতে মোট ১৩ হাজার ৯০২টি মাদ্রাসা এবং মোট ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ২৫২ শিক্ষার্থীর তথ্য উঠে আসে। যদিও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই জরিপে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক মাদ্রাসার তথ্যই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া প্রতি বছরই বাড়ছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা।


