ধরুন, আপনি হাজার বছর আগেকার ভারতবর্ষে গঙ্গার পাড়ের কৃষক। মাঠের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন, সূর্য প্রতিদিন একটু করে সরে যাচ্ছে পশ্চিমে, শস্যের মাথা নুয়ে পড়েছে, বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ। আপনি জানেন এই সূর্যই বলে দেবে কখন বীজ বোনা যাবে, কখন খাজনা দিতে হবে, আর কখন উৎসব-পার্বণ ঘনিয়ে আসবে।তবে আপনি একা নন। মিশর, ব্যাবিলন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড-সবখানেই একেকজন কৃষক ঠিক এই সূর্যের চলনে সময়ের ছন্দ বুঝে নিচ্ছে। তারা জানে, নতুন বছর শুরু হয়েছে।
নববর্ষ কেবল একটি দিন নয়, একটি প্রতীক, একটি সময়চক্রের পুনর্জন্ম। প্রতিটি সমাজ, প্রতিটি ক্যালেন্ডার নিজের মতো করে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বের নানা সংস্কৃতিতে নববর্ষ উদযাপন হয় বছরের একেবারে নির্দিষ্ট একটি সময়ে, ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে। কেন? এই প্রশ্ন আমাদের নিয়ে যায় জ্যোতির্বিদ্যার গভীরে, সূর্যের অবস্থান, কৃষির ঋতুচক্র, রাজনীতি এবং ধর্মের ছায়ায়।
জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সূর্য প্রবেশ করে মেষ রাশিতে, এই ঘটনাকে বলা হয় Solar Ingress into Aries।সৌর জ্যোতিষ মতে এটাই প্রকৃত নববর্ষ, কারণ এটি সূর্যের নতুন রাশিচক্রে প্রবেশ এবং ঋতুর পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়। এই সময় পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে দিন ও রাত প্রায় সমান হয়। বহু সংস্কৃতির কাছে এটি জীবন ও সময়ের পুনর্জাগরণ। ফলে যেসব সভ্যতা সৌর ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে তাদের নববর্ষ প্রায়শই এই সময়েই আসে।
সময়ের ধারণা মানব সভ্যতার এক আদিম অনুসন্ধান। প্রাচীন মিশরীয়রা সূর্যের ভিত্তিতে ৩৬৫ দিনের ক্যালেন্ডার তৈরি করে, ব্যাবিলনীয়রা চন্দ্র ও সৌর উভয় চলনের ওপর নির্ভর করে সময় নির্ধারণ করে। ভারতের উপমহাদেশে গড়ে ওঠে সৌরসিদ্ধান্ত নামক জ্যোতির্বিদ্যাভিত্তিক গ্রন্থ, যেখানে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান দিয়ে বছর গণনার পদ্ধতি নির্ধারিত হয়। এই ক্যালেন্ডারগুলো কেবল সময় পরিমাপের জন্য ছিল না, বরং ধীরে ধীরে কৃষিকাজ, ধর্মীয় উৎসব এবং শাসন ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিও হয়ে ওঠে।আমাদের পহেলা বৈশাখ, ভারতের পাঞ্জাবের বৈশাখী, কেরালার বিষু, তামিলনাড়ুর পুতান্ডু, নেপালের নববর্ষ, শ্রীলঙ্কার আলুথ আউরুদ্দা, থাইল্যান্ডের সংক্রান, লাওসের পি মা লাও এবং কম্বোডিয়ার চোল চনাম থমাই-সব নববর্ষ উৎসবই ঘটে এপ্রিলের ১৩ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে। এই মিল কোনো ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা নয়, এক গভীর জ্যোতির্বিদ্যা ও কৃষিনির্ভর বাস্তবতার ফল।
সূর্য যখন মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, তখনই এই সব অঞ্চলে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে তা বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, বহু জাতি-রাষ্ট্র, ধর্ম ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও, আকাশের সূর্য তাদের সবাইকে এক অভিন্ন সময়চক্রে বেঁধে রাখে। বাংলা নববর্ষ আজ আমাদের উৎসব, গান, আলপনা, পান্তাভাত আর বৈশাখী মেলায় আবদ্ধ হলেও তার জন্ম কিন্তু ছিল গভীরভাবে জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে সংযুক্ত।মুঘল সম্রাট আকবর ফসলি সন প্রবর্তন করেন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে, কারণ হিজরি চান্দ্রবর্ষ এ অঞ্চলের কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। সেই ফসলি সনকেই সংস্কৃতির সুতোয় বুনে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাংলার নববর্ষ। কিন্তু এর ঐতিহ্য আরও প্রাচীন। প্রাচীন বঙ্গদেশে সূর্য-নির্ভর কৃষিজীবন রীতিমতো ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গাঁথা ছিল। বসন্তের শেষে, গ্রীষ্মের দ্বারপ্রান্তে এই নববর্ষ ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নবচুক্তি।
আজ আমরা বৈশাখকে দেখি কেবল সাংস্কৃতিক চোখে, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে সময় গণনার এক বিজ্ঞানসম্মত সৌরসূত্রও।শাসকরা কেবল ভূমির নয়, সময়ের ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। আকবরের ফসলি সন, প্রাচীন রোমের গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার কিংবা পারস্যে নওরোজের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সবই প্রমাণ করে যে ক্যালেন্ডার নির্ধারণ ছিল রাজনীতির এক সূক্ষ্ম হাতিয়ার। প্রশাসনিক প্রয়োজনে সূর্যভিত্তিক সময় গণনা চালু হলেও, তা ধীরে ধীরে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নেয়। নববর্ষের সময় শুধু খাজনা বা কৃষি নয়, বহু সংস্কৃতিতে এটি আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের সময়ও বটে। ইহুদিদের রোশ হাশানাহ, পারসিদের নওরোজ, বৌদ্ধদের থিংইয়ান, হিন্দু নববর্ষ-সব উৎসবেই দেখা যায় আত্মশুদ্ধি, পূর্বপুরুষ স্মরণ এবং শুভ সূচনার তীব্র উপস্থিতি।
কেউ কেউ আগুনের মধ্যে দিয়ে আত্মাকে বিশুদ্ধ করে, কেউ ফুল ও ফল উৎসর্গ করে জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। আবার কেউ পবিত্র জল ছিটিয়ে পাপ ধুয়ে ফেলে। মাথার উপরের সূর্য এখানে কেবল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু নয়, বরং আধ্যাত্মিক আলোর প্রতীক।আজকের বিশ্বে আমরা ১ জানুয়ারিকেই ইংরেজি ‘নিউ ইয়ার’ বলি, কারণ গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক সৌর ও চন্দ্র নববর্ষ এখনও টিকে আছে, লোকায়ত সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে। বিশ্বায়ন যেখানে একরৈখিক সময় ধারণা চাপিয়ে দেয়, সেখানে বাংলা নববর্ষ বা সংক্রান্তি জাতীয় উৎসবগুলো দেখায় সংস্কৃতি কীভাবে নিজস্ব ছন্দে বেঁচে থাকতে জানে। সময় এখানে কেবল ঘড়ির কাঁটা নয়, বরং শিকড় ধরে জেগে থাকা গান, রং, খাবার আর স্মৃতির ধারক।
তাহলে সূর্য কি কেবল আলো আনে, না কি ক্যালেন্ডারের প্রাণও?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের ঐতিহাসিক উপলব্ধিতেই লুকানো। সূর্য তার নির্ধারিত পথে চলে, কিন্তু মানুষের চেতনার ইতিহাসে সে হয়ে ওঠে সময়ের পথনির্দেশক। নববর্ষ তাই কেবল একটি তারিখ নয়, একটি চক্রের সমাপ্তি ও আরেকটির সূচনা। এই চক্রে আছে আকাশের নীতি, মাটির টান, শাসকের শৃঙ্খল আর মানুষের কল্পনার রঙ। আর এই সব মিলেই গড়ে ওঠে এক জ্যোতির্বিদ্যাগত সংস্কৃতি-যেখানে সূর্য শুধু আলো নয়, ইতিহাসের ছন্দ রচয়িতা।


