তুভান থ্রোট সিংগিং , প্রকৃতির আত্মার সাথে সঙ্গীতের এক আধ্যাত্মিক সংযোগ

তুভান থ্রোট সিংগিং একটি প্রাচীন ও অনন্য সঙ্গীত শৈলী, এটি মঙ্গোলিয়া এবং সাইবেরিয়ার তুভা অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য অংশ। এই সঙ্গীতে অদ্ভুত ও রহস্যময় ভাবে একজন গায়ক বা গায়িকা একসাথে একাধিক সুর সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। এটি অতি পুরনো সঙ্গীত প্রথা, যা আধ্যাত্মিক এবং শামানিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তুভান থ্রোট সিংগিং ‘হুপিং’ বা ‘খোমুস’ নামেও পরিচিত। এর উৎপত্তি ছিলো প্রাচীন তুভা জনগণের মধ্যে। এটি মূলত ভূত-প্রেত, প্রকৃতির আত্মা এবং আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করার জন্য তাদের আধ্যাত্মিক এবং শামানিক ঐতিহ্যের একটি অংশ ছিলো। তুভা জনগণ বিশ্বাস করতেন যে, এই সঙ্গীত তাদের আত্মার শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে এবং প্রকৃতির আত্মাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে।

তুভান থ্রোট সিংগিংয়ে গায়করা একসাথে একাধিক সুর সৃষ্টি করতে সক্ষম। গলার কৌশল ব্যবহার করে তাদের গলার ভেতরের অংশে দুইটি বা ততোধিক সুরের কম্পন তৈরি করেন। এই সঙ্গীত শৈলীতে সাধারণত প্রধান সুরের পাশাপাশি এক বা একাধিক হারমনি সৃষ্টি করা হয়। গায়ক বা গায়িকার গলার নীচের অংশে কিছু গভীর সুর উৎপন্ন হয়, যেটি শুনতে অনেকটা গর্জনের মতো শোনায় এবং উচ্চ কণ্ঠে আরও সূক্ষ্ম ও মিঠে সুর শোনা যায়। এই সঙ্গীতের মধ্যে সাধারণত তিনটি প্রধান ধরন থাকে। খোমুস, এটি একটি মৃদু, সুরেলা সুর যা গলার নিচের অংশে তৈরি হয়। সুগা, এটি গলায় কাঁপনের সৃষ্টি হওয়া উচ্চতর সুর করে এবং সঙ্গীতের গভীরতা বৃদ্ধি করে। আর ইন-সোং এক ধরনের পল্লবী সুর, এটি একেবারে সিংগিংয়ের শেষের অংশে তৈরি হয়, সাধারণত নৃত্য বা পূজার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে।

তুভান থ্রোট সিংগিংয়ের মূল লক্ষ্য ছিল আধ্যাত্মিক শক্তির উদ্ভব এবং প্রকৃতির আত্মাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। শামানরা বিশ্বাস করতেন, থ্রোট সিংগিংয়ের মাধ্যমে তারা আত্মাকে মুক্ত করে এবং পূর্বপুরুষদের আত্মাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হতেন। সঙ্গীতের মাধ্যমে তারা পৃথিবী ও আকাশের মাঝে সেতু স্থাপন করতে পারতেন, যেটি তাদের আধ্যাত্মিক ভ্রমণ ও শক্তি সঞ্চারে সহায়ক ছিল। তুভান থ্রোট সিংগিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গভীর সম্পর্ক প্রকৃতির সঙ্গে। তুভা জনগণের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস অনুসারে সঙ্গীত এক ধরনের জীবন্ত শক্তি। এটিই কেবল প্রকৃতির শক্তি, যেমন নদী, পাহাড়, বৃষ্টি, বাতাস, এবং পশুদের আত্মাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। সঙ্গীতশিল্পীরা তাদের পরিবেশ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে এবং পরিবেশের প্রতিটি সুরকে তাদের গলায় তুলে ধরেন। এই কারণে তুভান থ্রোট সিংগিং প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং সংযোগের প্রতীক হয়ে ওঠে।

থ্রোট সিংগিংটি মূলত তুভা জনগণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আধুনিক যুগে এটি বিশ্ব সঙ্গীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। এই সঙ্গীত শৈলী এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশংসিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সঙ্গীতজ্ঞরা এটি তাদের সঙ্গীত রচনা এবং পরিবেশনায় ব্যবহার করছেন। বিশ্বের অনেক সঙ্গীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এখন থ্রোট সিংগিং শেখানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং এটি বিশ্ব সঙ্গীত সংস্কৃতিতে এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তুভান থ্রোট সিংগিং শুধুমাত্র একটি সঙ্গীত শৈলী নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির আত্মা, আধ্যাত্মিক শক্তি, এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু। তুভা জনগণের এই সঙ্গীত শৈলী আজও তাদের জীবনের অমূল্য অংশ হিসেবে টিকে রয়েছে এবং এটি সারা পৃথিবীতে সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন