ঢাকার বিষাক্ত বাতাস – কতটুকু জানি , কী করতে পারি ?

কল্পনা করুন, আমাদের অনায়াসে গ্রহণ করা শ্বাস নীরবে আমাদের জীবন থেকে আয়ু কেড়ে নিচ্ছে। এটি আর নিছক কল্পনা নয় ২০২১ সালে বায়ুদূষণ ৮.১ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ কেড়েছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রতি আটটি মৃত্যুর মধ্যে একটির সমান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি তিনটি মৃত্যুর মধ্যে একটির জন্য দায়ী। গ্লোবাল ডিজিজ বার্ডেন রিপোর্ট অনুসারে, এটি উচ্চ রক্তচাপের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা কাউকে ছাড় দেয় না। এই হুমকি দুইভাবে আসে। রাস্তায় দূষিত বাতাস ও ঘরের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ধোঁয়া—যেমন রান্নার আগুন থেকে নির্গত ধোঁয়া বা ধুলোময় ঘরবাড়ির বায়ু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, আমাদের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এমন বিষাক্ত বাতাস গ্রহণ করে যা ধীরে ধীরে আমাদের শরীরে বিষের মতো কাজ করে। অতিক্ষুদ্র কণিকা—PM2.5—আমাদের শ্বাসযন্ত্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসজনিত রোগগুলোর (যেমন COPD) ৪৮ শতাংশ বাতাসে এই ক্ষুদ্র কণিকার কারণে হয়, আর ২০২১ সালে ৩৪ শতাংশ অপরিণত শিশু জন্মের পেছনেও রয়েছে বায়ুদূষণের ভূমিকা।

ঢাকার বাতাস বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর। নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় থাকা এই নগরীর বাতাসে থাকে ইটভাটার কালো ধোঁয়া, যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি ও কলকারখানার দূষণ—এসবই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফসল। সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) প্রায়শই ২০০-এর ওপরে থাকে—যা “অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর” হিসেবে চিহ্নিত, প্রতিদিনের জন্যই ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের জন্য এক দুঃসহ পরীক্ষা। ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (CASE) প্রকল্পের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ঢাকার ৭৫% দিন ছিল শ্বাস নেওয়ার জন্য অনুপযুক্ত। এমনকি ২০২০ সালেও অর্ধেকের বেশি দিন ছিল বিপজ্জনক। ফলে লাখো মানুষের জন্য এটি অবিরাম কাশির কারণ, নীরবে বিকশিত ক্যান্সারের উপাদান, এবং অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালে AQI-US মানদণ্ড অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ১৩তম স্থানে ছিল। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা একটানা ১১ দিন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে ছিল, যখন AQI ২৪৩ ছাড়িয়ে যায় এবং ১০ ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ ৩৯২-এ পৌঁছে। এমনকি এশিয়ার অন্যতম দূষিত শহর দিল্লি ও লাহোরকেও ছাড়িয়ে যায়। ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত IQAIR-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাতাস ১৮ দিন ছিল “অস্বাস্থ্যকর”, ১৫ দিন “অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর” এবং ১ দিন “বিপজ্জনক”।

২০১৫ সালে নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর এয়ার রিসার্চ পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, শিল্প কারখানা, যানবাহন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির দহন ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। প্রতিবেদন অনুসারে, এই তিনটি খাত মিলে প্রতি বছর ঢাকার বাতাসে ১৯,০০০ টন PM2.5 নির্গত করে, যার মধ্যে শিল্প খাত একাই ১৭,৫৫৬ টন অবদান রাখে। শিল্প খাতই সালফার অক্সাইড (SOx)-এর প্রধান উৎস, বছরে প্রায় ৬০,০০০ টন নির্গত হয়। অন্যদিকে, নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) নির্গমনের ক্ষেত্রে যানবাহনই প্রধান (৭,৫০০ টন/বছর), এর পরে শিল্প কারখানাগুলো (২,০০০ টন/বছর)। কার্বন অক্সাইড (COx) নির্গমনের দিক থেকে যানবাহন (১৮,৪৫০ টন/বছর) এবং জীবাশ্ম জ্বালানির দহন (১২,৩৫০ টন/বছর) প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় বায়ু মান নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা ২০২৪-২০৩০ (Bangladesh National Air Quality Management Plan 2024-2030) প্রতিবেদনে ঢাকার PM2.5 দূষণের ছয়টি প্রধান উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে: গৃহস্থালি জ্বালানি দহন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইটভাটা, কঠিন বর্জ্য, সড়কের ধুলো এবং পরিবহন। এর মধ্যে, গৃহস্থালি জ্বালানি দহন সর্বাধিক দূষণ সৃষ্টি করে (২৮%), আর পরিবহন সবচেয়ে কম (৪%)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ইটভাটা ঢাকার মোট PM2.5 দূষণের মাত্র ১৩% অবদান রাখে। তবে এটি শিল্প দূষণের কথা উল্লেখই করেনি, যা বিস্ময়কর। নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর এয়ার রিসার্চ-এর গবেষণায় শিল্পখাতকে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস বলা হলেও, জাতীয় প্রতিবেদনে গৃহস্থালি জ্বালানিকে সবচেয়ে বড় দূষণকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া জাতীয় প্রতিবেদনে গ্যাস দূষণের কোনো তথ্য নেই এবং কোনো গবেষণাই ওজোন দূষণকে বিবেচনায় নেয়নি। এই অসংগতি ও তথ্যের অভাব দেখিয়ে দেয় যে, একটি ব্যাপক ও বিস্তারিত গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।

ঢাকার বায়ুদূষণে ঋতু পরিবর্তনের বড় প্রভাব দেখা যায়। শীতকালে (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি) বায়ুদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে, আর বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) তা কমে যায়। তবে গ্রীষ্ম এবং বর্ষার পরের সময়ে বায়ুদূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও, এটি এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশের জাতীয় বায়ু মান নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রম করে। একই প্রবণতা দেশের অন্যান্য বড় শহরেও দেখা যায়। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মানুষের কর্মকাণ্ড এই ঋতুগত তারতম্যের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। শীতকালে বৃষ্টিপাত কম থাকে, নির্মাণকাজ বেড়ে যায় এবং এলোমেলোভাবে বালু ভরাট চলতে থাকে, যা দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শীতকালীন বাতাস ঢাকার উপর দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং শহরতলির ইটভাটার ধোঁয়া বইয়ে নিয়ে আসে, যা বাতাসকে অত্যন্ত দূষিত করে তোলে।

ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য সর্বাধিক অভিযুক্ত শিল্প হলো ইটভাটা। ১৯৯০ সালে ঢাকার আশেপাশে প্রায় ২৫০টি ইটভাটা ছিল। ২০০০ সালের মধ্যে এর সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৮৫০-তে পৌঁছায়, মূলত নির্মাণ শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে। গত দুই দশকে, এই সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। বর্তমানে এই ইটভাটাগুলো বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও বংশী নদীর তীরে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ৪০০ ছাড়িয়ে যায়, যা স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন তৈরি করে।

বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন (প্রকাশিত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩) অনুযায়ী, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর বায়ুদূষণের প্রায় ৩০% ভারত থেকে আসে। শীতের শুরুতে, উত্তর-পশ্চিম দিকের বাতাস ভারতের ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি থেকে ধূলিকণাযুক্ত ধোঁয়া বাংলাদেশে বয়ে আনে। এটি গঙ্গা নদীর প্রবাহ অনুসরণ করে ধোঁয়ার নদীর মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের পুরো আকাশ ঢেকে ফেলে, শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মিলিয়ে যায়। বায়ু দূষণের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো যথাযথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বাংলাদেশ সরকার ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (CASE) প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ু দূষণ পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। এই প্রকল্পের অধীনে বায়ুর গুণমানের তথ্য সরাসরি প্রদানের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) ১১টি শহরে ১৬টি “নিরবিচ্ছিন্ন বায়ু গুণমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (CAMS)” স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশ ২০২৪-২০৩০ সালের জন্য “জাতীয় বায়ু গুণমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (NAQMP)” চালু করেছে, যা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশিত মান অনুসারে বার্ষিক PM2.5 মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা “বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা (২০২২)” বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় করবে। তবে এই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন— এতে দূষণকারী সংস্থাগুলোর জন্য কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি, কেবল সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। শিল্প কারখানার বিষাক্ত নির্গমন নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো কার্যকর নির্দেশনা নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন