” … এমন ক্রান্তিলগ্নে অধ্যাপক ইউনূস দেশ ও জাতির নেতৃত্বের হাল ছাড়বেন না। তাকেই নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথরেখা তৈরি করতে হবে।
হয়তোবা আমরা গণমাধ্যম ও দেশের জনগণ ড. ইউনূসের গত ১০ মাসের অর্জনের মর্ম পুরোপুরি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু একইভাবে তারও স্বীকার করা উচিত যে এই সময়ে সরকারও কিছু গুরুতর ভুল করেছে।
তাকে স্বীকার করতে হবে যে বিগত মাসগুলোতে বাংলাদেশ ক্রমেই এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা নেই বললেই চলে; সড়কে প্রতিনিয়ত বিক্ষোভ ও যান চলাচল বাধাগ্রস্ত করাই দাবি আদায়ের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা এখনো আত্মবিশ্বাস সংকটে ভুগছে। এক ‘মনোমুগ্ধকর প্রেজেন্টেশনে’র পরেও প্রকৃতপক্ষে দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ আসেনি। অধ্যাপক ইউনূসকে এখন এই সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। এটি তার গৌরবময় জীবনের অন্যান্য যেকোনো অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন।
আমরা তাকে অনুরোধ করছি এটা বিবেচনায় নিতে যে, এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল তার পদত্যাগ দাবি করেনি। তবে শুধু কিছু শিক্ষার্থী—যাদের তিনি সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছেন—তারাই তাকে এই কথা বলার সাহস দেখিয়েছে যে, ‘মনে রাখবেন, আপনাকে আমরা ক্ষমতায় এনেছি, আমরা সরিয়েও দিতে পারি।’ আমরা এখনো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর আস্থা রাখি, তাকে বিশ্বাস করি, ভরসা করি।
কিন্তু অধ্যাপক ইউনূসকেও বুঝতে হবে, সব কিছু তার প্রত্যাশামতো এগোয়নি এবং সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে নিজের টিম পুনর্গঠন করতে হবে এবং এখন পর্যন্ত যেসব পদ্ধতি তিনি অনুসরণ করেছেন, তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি সরকার প্রধানকেই এটি করতে হয়। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং এটাকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া একেবারেই উচিত নয়।
… বিশ্বব্যাপী তাঁর সম্মান, অগণিত পুরস্কার, সম্মানসূচক একাধিক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি, অন্তহীন প্রশংসা কখনোই তাকে সরকার পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করেনি।
… যখন তিনি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে রাজনীতির ঘোলাটে পরিবেশে পা রাখলেন, তখন তিনি বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন এবং যাদের তিনি ‘নিয়োগকর্তা’ হিসেবে অভিহিত করেন, তাদের দ্বারা পুরোপুরি প্রভাবিত হয়ে পড়লেন।
ইউনূস সরকারের কার্যক্রম নিয়ে চূড়ান্তভাবে কোনো মন্তব্য করার সঠিক সময় এখনো না এলেও এটুকু বলা যায় যে, ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকার মানেই যেহেতু অস্থায়ী সরকার, তার জন্য ১০ মাস মোটেই কম সময় নয়। এই কাজের জন্য তিনি অনভিজ্ঞদের নিয়ে (যদিও সবাই নয়) একটি টিম গঠন করেছেন। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে তিনি দক্ষতার সঙ্গে সেই টিম পরিচালনা করতে পারেননি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার কয়েকজন উপদেষ্টা ক্ষমতার প্রতি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, তারা তাদের মূল দায়িত্ব পালনের চেয়ে সরকারের মেয়াদ বাড়ানোর দিকেই মনোযোগী হয়ে পড়েন। … চলমান পরিস্থিতিতে কিছু পদক্ষেপ জরুরিভাবে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে:
—প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা। কয়েক মাস আগে বলা হয়েছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন। এখন বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।
—উপদেষ্টা পরিষদে রদবদল ও পুনর্গঠন করা, যাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য পূরণ করা যায়।
—তিন বাহিনীর প্রধানদের ডেকে বর্তমান দূরত্ব কমানো। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পৃক্ত না করার বিষয়ে সেনাপ্রধানের অভিযোগের বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে মীমাংসা করতে পারেন। কারণ আমাদের সেনাবাহিনীও গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। … “


