ডেঙ্গু বাংলাদেশে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে প্রতিটি বর্ষায় প্রাদুর্ভাব ঘটাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুকে নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিস হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা মূলত সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। শহরাঞ্চলের অব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত পানি ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনের কারণে মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনার ঘাটতি মশাবাহিত রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি সুযোগ তৈরি করে। দেখা যায় ২০২৩ সালে বর্ষা-পরবর্তী সেপ্টেম্বর মাসটি ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। সেদিন দেশের মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ এবং মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘটেছিল। অক্টোবর ও নভেম্বরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালেরও অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সর্বাধিক আক্রান্ত লক্ষ্য করা গেছে। চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এবং সেপ্টেম্বর থেকে কার্ভটি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী তিন মাসেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কীটনাশক ব্যবহারের মধ্যে লার্ভাল স্টেজে লার্ভিসাইড এবং অ্যাডাল্ট স্টেজে অ্যাডাল্টিসাইড ব্যবহৃত হয়। তবে কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে কীটনাশক সঠিক মাত্রায়, সময়মতো এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি কীটনাশকের গুণগত মান, প্রস্তুতকরণ, গুদামজাত প্রক্রিয়া, পরিবহন ও ডিসপোজাল পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত হতে হবে। প্রয়োগকৃত কীটনাশক যথাযথ না হলে মশার ঘনত্ব কমবে না বরং উপকারী কীটপতঙ্গের মৃত্যু ঘটাবে, যা পরবর্তীতে মশার দৌরাত্ম্য বাড়াবে।
কিছু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্রয়ের সময় পরীক্ষা করা নমুনা এবং মাঠে প্রয়োগকৃত কীটনাশকের কার্যকারিতার মধ্যে পার্থক্য থাকে। এর ফলে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকর উপাদানের পরীক্ষা অপরিহার্য। এই পরীক্ষার জন্য অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব এবং বিশেষজ্ঞ দলের উপস্থিতিতে দৈব চয়ন পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা উচিত। এর মাধ্যমে মশার ঘনত্ব কমানো এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
পরিবেশ ও মানবজাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ম্যালাথিয়নসহ অন্যান্য বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা কমে এবং লক্ষ্যপোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পল হ্যারম্যান মুলারের আবিষ্কৃত ডিডিটি প্রমাণ করেছে কোনো পদার্থের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশ ও মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিবেশবান্ধব বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল উপাদানগুলোর ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে কীটনাশক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সঠিক কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর জনসচেতনতা, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অপরিহার্য। রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের লক্ষ্য হতে হবে প্রতিটি জীবন রক্ষা করা এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সীমিত করা।


