যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ককেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এই নীতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর উপর, যাদের বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন যখন “পারস্পরিক বাণিজ্য”র নামে বিভিন্ন দেশের উপর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে, তখন আফ্রিকার বহু দেশ বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত দক্ষিণ আফ্রিকা, তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো শুল্কের উচ্চহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে যে, এই শুল্কহার ভুল বাণিজ্য বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে আরোপ করা হয়েছে। তবে, এই চাপের মধ্যেও ১৮টি দেশ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে, যাদের জন্য শুল্কহার ১৫ শতাংশে সংশোধন করা হয়।
লেসোথোর মতো দরিদ্র এবং ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশও এই নীতির বলি হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্যামুয়েল ম্যাটেকানে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য বন্ধ হওয়া এবং অতিরিক্ত শুল্কের কারণে হাজার হাজার মানুষের চাকরি হারিয়ে গেছে। শিল্প খাত ভেঙে পড়ছে।
এই সংকটের সুযোগ নিয়েছে চীন। বাণিজ্যে আফ্রিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ার কৌশলগত পরিকল্পনায় থাকা চীন এই মুহূর্তে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে শুরু করেছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। যা স্বাভাবিকভাবেই আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
নাইজেরিয়ার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বিসমার্ক রেওয়ান বলেন, “আমরা সরাসরি চীনের হাতে চলে যাচ্ছি। এটাই হলো দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি।” তার মতে আফ্রিকা এখন চীনের দিকে ঝুঁকছে এবং চীন হয়ে উঠেছে তাদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
তবে এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কার কথাও জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি বাজারে সুরক্ষা না থাকে তাহলে চীনা সস্তা পণ্য আফ্রিকার বাজার দখল করে ফেলবে। এতে আফ্রিকার নিজস্ব শিল্প খাত হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, আফ্রিকা কি চীনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে উঠবে? না কি এই সংকট থেকে বেরিয়ে নিজস্ব অর্থনীতিকে মজবুত করবে? অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, এই সংকট হয়তো আফ্রিকার জন্য একটি সুযোগ। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়িয়ে এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নে মনোযোগ দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (AfCFTA) এর বাস্তবায়ন এই সংকটে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে এখনও কার্যকর ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি আফ্রিকার জন্য যেমন এক বিপর্যয়, তেমনি চীনের উত্থান তাদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা যেন নতুন নির্ভরতার শৃঙ্খলে পরিণত না হয়, সেজন্য প্রয়োজন দক্ষ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।


