বাংলা ট্রিবিউনের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি রঞ্জন বসুর প্রতিবেদন : ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন যে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দেবে, সে ব্যাপারে দিল্লিতে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায় সবাই একমত। ‘যতই বলা হোক যে আমেরিকায় ক্ষমতার পালাবদল হলেও সে দেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটা ধারাবাহিকতা ও ‘বাইপার্টিজান’ ঐকমত্য থাকে, আমরা সবাই জানি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সে কথাটা সত্যি নয়’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিবিদ, যিনি ওয়াশিংটনেও ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশ নিয়ে যে পরিমাণ ‘আগ্রহ’ ও ‘গরজ’ দেখিয়েছে, ট্রাম্প জমানায় তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাবে না বলে তিনি ইঙ্গিত করছেন। এর কারণও সহজ ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে এরকম ‘হস্তক্ষেপে’র পেছনে অর্থ ঢালাকে অপচয় বলেই ধরা হয়!
ভারতে অনেকেই যেটা বিশ্বাস করেন, তা হলো ট্রাম্প তার ২.০ মেয়াদে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি থেকে হয়তো আমেরিকাকে অনেকটাই সরিয়ে নেবেন। যার অর্থ হলো এই অঞ্চলে ভারত আবার তাদের নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরির সুযোগ পাবে। বস্তুত এটা দিল্লিতে অনেকেই মানেন যে ২০০৯ সাল থেকে ওবামা প্রশাসনের সময়ও আমেরিকা বাংলাদেশকে প্রধানত ভারতের চোখ দিয়েই দেখতে অভ্যস্ত ছিল। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় আসার পরও সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ২০২১ বাইডেনের ডেমোক্র্যাট প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমেরিকা কিন্তু ভারতকে এড়িয়ে সরাসরি বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ দেখাতে থাকে।
বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অবস্থান ছিল, তারা এখানে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও প্রগতিশীলতার পক্ষে, যা মূলত শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন বলেই পর্যবেক্ষকরা ধরে নিতেন। অন্যদিকে আমেরিকার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ, নির্বাচন অবাধ নয় এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিও অত্যন্ত শোচনীয়, অবিলম্বে যার সংস্কার দরকার। ফলে বাংলাদেশ ইস্যুতে এই দুই বন্ধু দেশের মতান্তর ও মনান্তর গোপন থাকেনি। ঠিক এক বছর আগে নভেম্বরে দিল্লিতে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের ‘টু প্লাস টু’ সংলাপেই দুই দেশের এই মতপার্থক্য সামনে চলে আসে।
বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার মধ্যে এই ধরনের তিক্ততা ও মতবিরোধ ট্রাম্প জমানায় নাটকীয়ভাবে কমে যাবে বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ‘নির্যাতন চলছে’ বলে ভারত সরকার ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বারবার বলে আসছে, ট্রাম্পের বিজয় সেই পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ড. ইউনূসের সরকার এক ধরনের ‘ডিনায়াল মোডে’ (পুরোপুরি অস্বীকার করার অবস্থানে) আছে – তারা এই গুরুতর বিষয়টিকে অতিরঞ্জন, ফেক নিউজ বা রাজনৈতিক কারণে হামলা বলে উড়িয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যেহেতু হিন্দু ভারতীয়-আমে- রিকানদের একটা বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করবেন না এবং সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখবেন বলেই ভারতের ক্ষমতাসীন দল প্রত্যাশা করছে।


