ট্যারিফ যুদ্ধে এর আগে যেভাবে হেরেছিল যুক্তরাষ্ট্র

ট্যারিফ মূলত শুল্ক, যা একটি দেশ অন্য দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করে। শুরুতে এই ট্যারিফ বা শুল্ক মূলত আরোপ করা হতো রাজস্ব আদায় বাড়াতে। এর বাইরে ট্যারিফ বসানো হয় স্থানীয় শিল্পকে সংরক্ষণ দেওয়ার জন্য। আর এখন ট্যারিফ বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যনীতি প্রয়োগের একটি অস্ত্র হিসেবে। একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বব্যাপীই রাজস্ব আদায়ের প্রধান উৎস ছিল এই ট্যারিফ। যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ১৭৯৮ থেকে ১৯১৩ সময়ে ট্যারিফ বা আমদানি শুল্ক থেকে আয় ছিল তাদের মোট ফেডারেল আয়ের ৫০ থেকে ৯০% পর্যন্ত। আর এখন সেই আয় কমে হয়েছে ২%। আসলে ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণবাদ থেকে আস্তে আস্তে সরে এসেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ভূমিকা ছিল। দেশটিতে ৭০% পণ্য যায় বিনা শুল্কে। সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন বিশ্বজুড়ে শুরু করে দিয়েছে ট্যারিফ-যুদ্ধ।

রাজস্ব আয় বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল ইনকাম ট্যাক্স বা আয়করব্যবস্থা চালু করেছিল ১৯১৩ সালে। তখনো আয়ের মূল উৎস ছিল নানা ধরনের আমদানি শুল্ক। তবে যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারে ট্যারিফ-যুদ্ধ শুরু করেছিল ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময়। এর আগেই অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে কংগ্রেস ফোর্ডনি-ম্যাককাম্বার অ্যাক্ট পাস করেছিল, যার মাধ্যমে ট্যারিফের হার ৪০ শতাংশে বাড়ানো হয়। ইউরোপের দেশগুলো তখনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। এর মধ্যে অবশ্য ইউরোেপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা শুরু করে এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনও বাড়তে থাকে। এতেই সমস্যা বৃদ্ধি পায় যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য উৎপাদকেরা তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে এবং অতিরিক্ত উৎপাদন হওয়ার কারণে কৃষিপণ্যের দামও কমে যায়। তখনই দেশটির কৃষিপণ্যকে সংরক্ষণ করার জোরালো দাবি উঠতে থাকে।

১৯২৯ সালে শেয়ারবাজারের ধস থেকে দেখা দেয় মহামন্দা। সংরক্ষণবাদীরা তখন শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ট্যারিফ বাড়িয়ে মার্কিন পণ্যকে সংরক্ষণ দিতে ১৯৩০ সালে দ্য স্মট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট ৪৪-৪২ ভোটে পাস হয়। এর মাধ্যমে সব দেশের জন্য ট্যারিফ আরও ২০% বাড়ানো হয়। অন্তত এক হাজার অর্থনীতিবিদ সে সময় এই আইনে ভেটো দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করেছিলেন। সেবার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ-যুদ্ধের পরিণতি ভালো হয়নি; বরং তিক্ত বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। দ্য সুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট পাস হওয়ার দুই বছরের মধ্যে ইউরোপের বড় বড় অর্থনীতির দেশ সমানসংখ্যক পাল্টা-শুল্ক আরোপ করে।পাল্টা-ট্যারিফ আরোপের ফলে ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্য দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। বহুসংখ্যক ব্যাংকের পতন ঘটে।বলা হয়, বিশ্ববাণিজ্যে একা হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র।

নতুন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট দায়িত্ব নিয়েই ট্যারিফ কমানোসহ এ থেকে বের হতে আলোচনা শুরু করেন। অবশেষে ১৯৩৪ সালে রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টস অ্যাক্ট পাস করা হয়। এর মাধ্যমে শুল্কহার কমান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এবং বাণিজ্য উদারীকরণকে এগিয়ে নেন। অর্থাৎ প্রথম ট্যারিফ-যুদ্ধে পরাজয় হয় যুক্তরাষ্ট্রের। এটা ঠিক যে দ্য স্পুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্টের কারণে ১৯৩০ সালের মহামন্দা হয়নি। শেয়ারবাজার ধস থেকে মহামন্দার শুরু। তবে এই আইন মহামন্দাকে আরও গভীর করছিল। সেই যুক্তরাষ্ট্র আবারও ট্যারিফ-যুদ্ধ শুরু করেছে। এর পরিণতিও কি ১৯৩০ সালের মতোই হবে?



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন