মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু, জিকা ও ইয়েলো ফিভার বিশ্বের বহু অঞ্চলে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম হুমকি হয়ে উঠেছে। এই রোগগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বহু দশক ধরে নানা কৌশল গ্রহণ করা হলেও, মশা দমন কার্যক্রমে এখনো টেকসই সমাধান পাওয়া যায়নি।তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা ছাড়া হয়েছে পরিবেশে, যার লক্ষ্য হলো রোগবাহী মশার জনসংখ্যা ধ্বংস করা।
এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে, যেখানে অবফবং ধবমুঢ়ঃর প্রজাতির জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত পুরুষ মশা পরিবেশে ছাড়া হয়েছে। এই প্রজাতির মশা যদিও মোট স্থানীয় মশার মাত্র ৪ শতাংশ গঠন করে, তবে মানুষের মধ্যে মশাবাহিত রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে এই পুরুষ মশাগুলো এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যাতে তারা বন্য নারী মশার সঙ্গে প্রজনন করলে তাদের স্ত্রীসন্তান লার্ভা অবস্থায় মারা যায়। কেবল পুরুষ সন্তান বেঁচে থাকে এবং পরবর্তী প্রজন্মে একই জিন বহন করে।যেহেতু কেবল নারী মশাই মানুষকে কামড়ায় এবং রোগ ছড়ায়, তাই স্ত্রী মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ কমানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই পদক্ষেপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটি রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত কীটনাশকের কারণে অনেক মশা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে, ফলে ঐ পদ্ধতিগুলো এখন অনেকাংশেই অকার্যকর। অন্যদিকে এই জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা নির্দিষ্ট প্রজাতিকে লক্ষ্য করে কাজ করে, তাই পরিবেশে অন্যান্য প্রজাতির ওপর এর প্রভাব কম। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বায়োটেকনোলজি কোম্পানি ভীরঃবপ, যারা এর আগেও ব্রাজিল, কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ, পানামা ও মালয়েশিয়ায় সফলভাবে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করেছে। এসব দেশে অবফবং ধবমুঢ়ঃর মশার সংখ্যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল, এটি এই কৌশলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্কও কম নয়। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা এবং পরিবেশবাদী সংগঠন এই ধরনের জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত জীব মুক্তভাবে পরিবেশে ছাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এই প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত।বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব আশঙ্কা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে গবেষণা চালানো উচিত, তবে প্রাথমিক ফলাফলগুলো আশাব্যঞ্জক। এই প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রে জিএম জীব নিয়ে পরিচালিত আরও কিছু পরীক্ষার অংশ, যেমন নিউ ইয়র্কে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ডায়মন্ডব্যাক মথ এবং অ্যারিজোনায় পিঙ্ক বলওয়ার্ম। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগগুলো একটি নতুন ধরনের পরিবেশবান্ধব, লক্ষ্যভিত্তিক রোেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সূচনা হতে পারে।
জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশার পরিবেশে ছাড়া একদিকে যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহসী প্রয়োগ, অন্যদিকে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য আশার আলো। যদি এই পদ্ধতি সফল হয়, তাহলে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও নজরদারি চালানো জরুরি। এমন প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলেই তা মানবজাতির জন্য আশীর্বাদে পরিণত হতে পারে।


