“জীবন আমার বোন” : যেখানে জীবন নারী নয়, প্রেম নয়, একটা ক্ষত

“জীবনের গন্ধ পেতাম, কিন্তু সে গন্ধের আর উৎস পাই না।” — মাহমুদুল হক, জীবন আমার বোন

একজন মানুষ ফিরে আসে শহরে। তার কোনো নাম নেই। নেই বাড়ি, নেই মা, নেই বোন। নেই পরিচিত কেউ। অথচ এই শহর একসময় ছিল তার। এখন শহরটি যেন নিজের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। দোকান খোলা, রিকশা চলে, মানুষ হাঁটে, কিন্তু তার চারপাশে কেবল স্তব্ধতা।

এইভাবে শুরু হয় মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন। কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং অস্তিত্ববাদী স্মৃতির অনুরণনে গড়া এক আত্মদর্শী ভ্রমণ। এখানে চিরাচরিত কাহিনি কাঠামো নেই, নেই উত্তেজনাকর দ্বন্দ্ব বা চমকপ্রদ সমাপ্তি।

নামহীন এক ব্যক্তি ফিরে আসে যুদ্ধোত্তর শহরে। সে খুঁজে বেড়ায় ‘জীবন’-কে। কে এই জীবন? প্রেমিকা? বোন? নাকি শুধুই স্মৃতির মায়া? এই অনুসন্ধান কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষকে নয়, বরং এককালের অস্তিত্বকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুল চেষ্টা। সে ফিরে পেতে চায় যুদ্ধের আগে হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে, সেই অচেনা বাড়িকে যেখানে উঠোনে বোন বসে থাকতো। কিংবা সেই নিজস্ব সময়কে, যেটা এখন কেবল ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতি।

উপন্যাসের সবচেয়ে দ্ব্যর্থপূর্ণ ও গভীর চরিত্র ‘জীবন’। তিনি কি একজন নারী, যাকে ভালোবাসা হয়েছিল? নাকি তিনি এক আত্মিক ধারণা। এক ‘অপরাপর’ যাকে ধরা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়? উপন্যাসের নামেই প্রশ্ন জেগে ওঠে, জীবন যদি বোন হয়, তবে সে কোথায়?

মাহমুদুল হকের গদ্য কাব্যিক নয়, বরং যেন নীরব আত্মস্বীকার। তাঁর বাক্যগুলো ছোট, সংযত, কিন্তু বিষণ্নতায় পূর্ণ। “আমার কোনো নাম ছিল না তখন, এখনো নেই।” এই একটি বাক্যই মানুষের অস্তিত্ব সংকট, নামহীনতার ব্যথা ও আত্মপরিচয়ের বিলাপ একসাথে ধারণ করে। গল্পে সংলাপ কম।বর্ণনা ছিমছাম, যেন পাঠক নিজেই একটি মানসিক যাত্রার সঙ্গী। হকের ভাষা যেন হেঁটে চলা, ঘুরে ফিরে নিজের ভেতরে ফেরা।

গল্পে সময় কখনো বর্তমান, কখনো অতীত। কখনো ভবিষ্যৎ, আবার কখনো ভবিষ্যতেরও পরে। ‘গতকাল’ যেখানে মা-বোন জীবিত ছিলেন। ‘আজ’ এক নষ্ট শহর। আর ‘আগামীকাল’ জীবন ফিরে আসবে কি না, সেই অনিশ্চিত প্রতীক্ষা। এইভাবে সময় চলে গহিনে, যেখানে স্মৃতি আর বাস্তবতা একে অপরকে প্রশ্ন করে।

পরিচিত জায়গায় গিয়ে মানুষটিকে কেউ চেনে না। সে বসে থাকে কিন্তু সময় চলে যায় অন্যদিকে। এটি শুধু শহরের পরিবর্তন নয়, এক ব্যক্তির মুছে যাওয়ার দৃশ্য। কখনো দেখা যায় জীবনকে, কিন্তু সে আবার হারিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে মানুষটি ফিরে যায় সেই পুরনো বাড়ির সন্ধানে। কিন্তু বাড়ি নেই শুধু তার গন্ধ যেন বাতাসে ভাসে। এ এক প্রগাঢ় স্মৃতিচারণ ও বাস্তবতার সংঘর্ষ।

মাহমুদুল হক নিজেই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের একজন নীরব, প্রজ্ঞাবান পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় রাজনীতি নেই, আছে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির ধ্বনি। এই উপন্যাসে হক যেন নিজের ভেতরের অস্তিত্ব সংকটের কথা বলছেন, বলছেন এমন এক যন্ত্রণার কথা, যার ভাষা নেই।

‘জীবন আমার বোন’ একধরনের অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতা। যারা আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগেছেন, যারা কারো জন্য ফিরেছেন অথচ তাকে আর পাননি, যারা শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেছেন কোনো ব্যাখ্যাহীন মুহূর্তে, তাদের জন্য এই উপন্যাস নিঃশব্দ আয়না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন