গ্রিস থেকে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে ইউরোপ

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, শুষ্ক আবহাওয়া ও প্রবল বাতাস মিলিত হয়ে এক নজিরবিহীন দাবানল সংকট তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশে বন ও ঝোপঝাড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করছে না, বরং প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, তুরস্ক, স্পেন, মন্টেনেগ্রো ও আলবেনিয়ায় ইতোমধ্যে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকির একটি জীবন্ত উদাহরণ।

তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও এজিয়ান উপকূলে একাধিক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অঞ্চলে প্রচুর পর্যটনকেন্দ্র থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও পর্যটকদেরও সরিয়ে নিতে হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক বাহিনী, সেনা ও স্বেচ্ছাসেবকরা মিলিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে প্রবল গরম ও বাতাস আগুন নেভানোর কাজকে জটিল করে তুলছে। কয়েকটি গ্রামে ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

স্পেনের আন্দালুসিয়া ও ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশে গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক বড় দাবানল লেগেছে। খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে গাছপালা ও ঘাস শুকিয়ে গিয়েছে, ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি অবস্থা জারি করে কয়েক হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে। স্পেনের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মন্টেনেগ্রোর উত্তর ও উপকূলীয় পাহাড়ি অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনের কারণে ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যাচ্ছে, যা শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করছে। স্থানীয় দমকল বাহিনী আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। গ্রিস ও ইতালি থেকে পাঠানো অগ্নিনির্বাপক বিমান ইতোমধ্যে সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। প্রাণহানির পাশাপাশি কৃষি জমি ও পশুপালনও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

আলবেনিয়ায় বিশেষ করে পেট্রেলা ও গ্রামশ অঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে একটি বিশেষ অগ্নিনির্বাপক দল, হেলিকপ্টার ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ঘন বনাঞ্চল এবং দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে আগুন নেভানোর কাজ ধীরগতিতে চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি গ্রাম আংশিকভাবে পুড়ে গেছে এবং প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে ইউরোপে এ ধরনের দাবানলের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ছে । তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘমেয়াদি খরা এবং প্রবল বাতাস এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, যদি বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের বিপর্যয় আরও ঘন ঘন ও মারাত্মক হবে।

তুরস্ক, স্পেন, মন্টেনেগ্রো ও আলবেনিয়ার এই দাবানল সংকট শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের প্রতিফলন। জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের উদ্যোগ না নিলে, ইউরোপসহ সারা বিশ্বের জন্য এই হুমকি আরও মারাত্মক রূপ নেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন