গাজা সংকট নিয়ে – ‘কান চলচ্চিত্র উৎসবের’ , তীব্র সাহসী প্রতিবাদ

২০২৫ সালের ৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসব শুধু বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মঞ্চই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এবারের উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, প্রযোজক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তারা বিভিন্ন উপায়ে গাজার সংকটের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন এবং মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।

সবচেয়ে আলোড়ন জাগানো ঘটনা ছিল ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক ফাতিমা হাসসুনার স্মরণ। তিনি গাজা পরিস্থিতি নথিভুক্ত করছিলেন একটি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে, যার নাম ছিল “Put Your Soul on Your Hand and Walk”। এটি উৎসবের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ ACID-এ নির্বাচিত হয়েছিল।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১৬ এপ্রিল গাজায় একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন হাসসুনা। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, বরং তা ছিল তথ্য, চিত্র ও সত্যের ওপর সরাসরি আঘাত। উৎসব আয়োজকরা তার স্মরণে বিশেষ শোকবার্তা দেন এবং ডকুমেন্টারিটি তার মৃত্যুর মাত্র এক মাস পর কান উৎসবে প্রদর্শিত হয়—ফ্রান্সের নীল সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে গাজার ধ্বংসস্তূপের ছবি তুলে ধরার এই মুহূর্ত ছিল এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদ।

ইরানের পরিচালক সেপিদে ফারসি গাজার মানবিক সংকট তুলে ধরতে ‘পুট ইওর সোল অন ইওর হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়াক’ নামক তথ্যচিত্রটি নির্মাণ ও প্রদর্শন করেছেন। এই তথ্যচিত্রে বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপের মাঝে জীবন যাপন করা গাজার মানুষের কষ্টের চিত্রায়ন করা হয়েছে। সেপিদে ফারসি বলেন, “আমার কাজ শুধু ছবি তোলা নয়, বরং মানবতার জন্য একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া।” তার এই কাজ কান উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

রবার্ট ডি নিরো তার বক্তব্যে বলেন, “মানবতার প্রতি এই আক্রমণ কখনোই অগ্রাহ্য করা যাবে না। আমাদের শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব হলো নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা।” তিনি গাজার বোমাবর্ষণের নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় ভূমিকা নিতে আহ্বান জানান।

লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও বলেন, “শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে আমাদের সবাইকে দাঁড়াতে হবে। গাজার নিরীহ মানুষদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করা অপরিহার্য।” তিনি সামাজিক মাধ্যমে গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে বিশ্ববাসীকে সচেতন করেছেন।

নাতালি পোর্টম্যান তার বক্তব্যে বলেন, “শিল্পীরা নীরব থাকলে অন্যায় বাড়বে। আমাদের অবশ্যই মানবাধিকার রক্ষায় সাহসী হতে হবে।” তিনি কান উৎসবের মঞ্চ থেকে ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতির আহ্বান জানান।

স্কারলেট জোহানসনও ফিলিস্তিনের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করেছেন এবং বলেন, “মানবতার জন্য আমাদের একসাথে কাজ করা উচিত।”

কান উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩৫০ জন প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা এক যৌথ বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তারা ইজরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমরা গাজার নিরীহ মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি জানাই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানাই।” এই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা মানবাধিকার রক্ষায় নীরব থাকবেন না এবং সাংস্কৃতিক মঞ্চ থেকে এই সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবেন।

ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী রচিদা দাতি কান উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির বিষয়ে বলেন, “রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক নতুন নয়। যখন সৃজনশীলতার ওপর আক্রমণ হয়, তখন শিল্পীর স্বাধীনতার প্রতি আমাদের বিশ্বাস অপরিহার্য।” তিনি আরও বলেন, “ফিলিস্তিনের সংকটের আলোকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাংস্কৃতিক মুক্তি ও মানবাধিকার পরস্পরের পরিপূরক।”

কান উৎসবের সময় সামাজিক মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রচার ব্যাপক হয়। হাজার হাজার মানুষ টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনের সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।

বিশেষ করে #StandWithPalestine, #SaveGaza, এবং #CannesForPalestine হ্যাশট্যাগগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা কান উৎসবের মঞ্চ থেকে উঠে আসা মানবিক বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

কান উৎসবের আয়োজকরা ফিলিস্তিনের সংকটের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে বিশেষ সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। যেখানে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই সেমিনারে বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, মানবাধিকার কর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অংশগ্রহণ করেন এবং বিশ্বকে সচেতন করার জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

কান উৎসবে অংশগ্রহণকারী ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের কাজের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তারা গাজার মানুষের জীবনযাত্রার কাহিনী, যুদ্ধের প্রভাব এবং প্রত্যাশার গল্প বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।

ফিলিস্তিনি পরিচালক আমজাদ আবু আলি বলেন, “আমাদের কাজ শুধু গল্প বলা নয়, বরং আমাদের মানুষের কষ্ট ও আশা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।” তার এই বক্তব্য কান উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির একটি প্রাণবন্ত উদাহরণ।

২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তথ্যচিত্র নির্মাতা সেপিদে ফারসির মানবিক কাজ থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, নাতালি পোর্টম্যানের সরাসরি প্রতিবাদ, প্রযোজক ও পরিচালকদের যৌথ বিবৃতি, ফরাসি সংস্কৃতিমন্ত্রীর সাংস্কৃতিক সমর্থন এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া-এসব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী মানবিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে।

এই উদ্যোগ শুধু ফিলিস্তিনের সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এনেছে না, বরং বিশ্ববাসীর মধ্যে মানবাধিকার ও শান্তির প্রতি সচেতনতা ও সহানুভূতি বৃদ্ধি করেছে। কান উৎসবের এই বার্তা স্পষ্ট – শিল্প ও সংস্কৃতির শক্তি দিয়ে আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে একত্রিত হতে পারি। ফিলিস্তিনের প্রতি এই সংহতি শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ নয়, এটি মানবতার জয় এবং শান্তির পথে এক নতুন আশা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন