গাজা – ব্যাংক ধ্বংস, এটিএম কাজ করছে না, ধসে পড়েছে অর্থনীতি

ইসরায়েল গত বছরের অক্টোবরে হামলা শুরুর সময় গাজায় নতুন মুদ্রিত শেকেল পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই সেখানে প্রচলিত মুদ্রার সংকট দেখা দেয়। নতুন নোট আসা বন্ধ থাকায় গাজার জনগণ বাধ্য হয়ে পুরোনো টাকাই বারবার ব্যবহার করছে।

যুদ্ধ শুরুর আগেও গাজায় লেনদেনের বেশিরভাগ (৮০ শতাংশের বেশি) হতো হাতে হাতে নগদ অর্থে। তবে এখন সেই অর্থব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে। গাজার ৫৬টি ব্যাংকের সব শাখা ধ্বংস হয়ে গেছে। আগে যেখানে ৯৪টি এটিএম ছিল, এখন মাত্র ৩টি আংশিকভাবে কাজ করছে। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের জন্য এটুকুই ভরসা।

এই অবস্থায় অনেকেই ফাটা-ছেঁড়া নোট দিয়ে কেনাকাটা করতে না পেরে এগোচ্ছেন মেরামতের দিকে। এক ব্যক্তি এখন দিনে ৫০০ থেকে ৬০০টি নোট মেরামত করেন—যদি তা ঠিক করার মতো হয়। প্রতি নোট মেরামতে তিনি নেন ২ শেকেল, যা প্রায় ৪০ পেন্সের মতো।

ইসরায়েলি বোমা হামলা, স্থল অভিযান ও খাদ্য, জ্বালানি আর ওষুধের ওপর নিষেধাজ্ঞায় গাজার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। এখন যা কিছু চলছে, তা মূলত চলছে রাস্তার হকার, দোকানপাট আর চুরি হয়ে আসা পণ্যের ফেরিওয়ালাদের ভরসায়।

শিল্প এলাকা, ব্যাংক আর কারখানা ধ্বংস বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাজায় বেশিরভাগ মানুষ এখন বেকার বা নিঃস্ব। নগদ টাকার ঘাটতিতে লেনদেন এখন অনেকটাই চলে গেছে বিনিময় পদ্ধতির (বার্টার সিস্টেম) দিকে—এক জিনিসের বদলে আরেক জিনিস। আর তা হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

গাজা শহরের আল-জালাআ স্ট্রিটের বাজারে থাকা সুহেইলা সাল্লাক বলেন, ‘কেউ ফেসবুকে পোস্ট দেয়—বাচ্চার দুধের একটি কৌটার বিনিময়ে চাই এক ব্যাগ ছোলা বা মটর। আমি তাদের মেসেজ করি, একমত হই—শুধু বাঁচার জন্য।’

এখন গাজার বেশিরভাগ মানুষই নগদ টাকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত এবং সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক সপ্তাহে সেই সাহায্য নিতে গিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। এসব কেন্দ্র পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, আর সেগুলো ঘিরে রয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা।

গাজায় চলমান যুদ্ধের ২১ মাসে এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত মে মাসের শেষ থেকে শুরু হওয়া নতুন কিছু সহায়তা কেন্দ্রে হামলায় প্রাণ গেছে আরও ৮০০ জনের। এ তথ্য জানিয়েছে হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

জাতিসংঘ গত জুন মাসে প্রায় ৪০০ বার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ত্রাণ পাঠানোর জন্য সমন্বয় করার চেষ্টা করে। কিন্তু এর ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই ইসরায়েল প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। অন্যদিকে, ইসরায়েল নিজে থেকে প্রতিদিন ৩২ ট্রাক ত্রাণ পাঠাচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে।

চলতি বছর টানা চার মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় একফোঁটা জ্বালানিও ঢোকেনি, যদিও প্রায় সব পরিষেবার জন্যই জ্বালানি অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ না থাকায় বেকারি, হাসপাতাল, সমাজসেবা, পানি পরিশোধন কেন্দ্র ও মানবিক সংস্থাগুলোকে চালু রাখতে হয়েছে জেনারেটর দিয়েই।

এই সপ্তাহে অবশেষে কিছুটা জ্বালানি প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেটাকে জাতিসংঘ স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি বলেছে, ‘এটা দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়।’

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতি অনুষদের ডিন সামির আবু মুদাল্লাহ বলেন, ‘জ্বালানির এই সংকট অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দাম বেড়েছে ৫৫০ শতাংশেরও বেশি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এমনকি চলাফেরাও এখন খুব ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন