বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সমস্যা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। বর্তমানে ২.৩ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে ভুগছে এবং ৩.১ বিলিয়ন মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যয় বহন করতে পারছে না। ২০১৭ সালের পর থেকে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। বিশেষত এশিয়া অঞ্চলে যেখানে ৪২৫ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টির শিকার। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশে ১৮.৮ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টির শিকার এবং ১২০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয় বহন করতে পারে না।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৪০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল রয়েছে এবং বাজারে পাওয়া ৬০ শতাংশ শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক পাওয়া গেছে। এই ভেজাল খাদ্য ৩৩ শতাংশ মানুষের বিভিন্ন রোগ এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে ৪০ শতাংশ শিশুর অসুস্থতার প্রধান কারণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার মাটিতে প্রয়োজনীয় জৈব উপাদানের অভাব রয়েছে। এটিও অনিরাপদ ফসল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সংকট নিরসনে ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফে নামক সংস্থা প্রান্তিক কৃষকদের জৈবপদ্ধতি অনুশীলনের মাধ্যমে একটি স্থায়িত্বশীল ও সহনশীল স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে। টেকসই উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্থাটি পাঁচটি কৌশল অবলম্বন করেছে:
পার্টিসিপেটরি গ্যারান্টি সিস্টেম (PGS) প্রবর্তন করে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য নিরাপদ ও জৈব চাষাবাদের মানদণ্ড অনুসারে সার্টিফিকেশন প্রদান। জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির চর্চার মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বাড়াতে ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি ও কৌশল বাস্তবায়ন। জৈব কৃষক দল গঠন ও জৈব চাষাবাদে সহায়তা করে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও জৈব কৃষিকে জনপ্রিয় করা। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সেবাদানকারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের
সম্পৃক্ত করা। ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা।
ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফের প্রকল্প কার্যক্রমের ফলে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্প এলাকায় ৫৫ শতাংশ কৃষক জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব ফসল উৎপাদন করছেন। ৬৮ শতাংশ পরিবারের খাদ্যে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রকল্পের সাথে যুক্ত ৪৫ শতাংশ কৃষকের মধ্যে ২০ শতাংশের আয় বেড়েছে বলে জানা গেছে জরিপে। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক, খাদ্য উদ্যোক্তা, ভোক্তা গোষ্ঠী, সার্টিফিকেশন সংস্থা, সুশীল সমাজ ও সরকারি খাতের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে যা খাদ্য নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট নিরসনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। জৈব কৃষি ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।


