এক সময় ক্যান্সারের জন্য টিকা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হতো। ছিলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অলীক স্বপ্ন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবের দোরগোড়ায়। এর পেছনে বড় অবদান রাখছে mRNA প্রযুক্তি, যেটি কোভিড-১৯ টিকা তৈরির ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।
এই একই প্রযুক্তি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি করেছে—ব্যক্তিকৃত ক্যান্সার টিকা। অর্থাৎ প্রতিটি রোগীর শরীর ও টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি করা হবে আলাদা টিকা, যা রোগীর দেহকে শিখিয়ে দেবে কীভাবে সেই নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।
এই পদ্ধতিতে প্রতিটি রোগী পাবে একেবারে নিজের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ইউকে-র এনএইচএস (NHS)-এর অনকোলজিস্ট লেনার্ড লি এই পরিবর্তনকে বলেছেন কোভিডের “সিলভার লাইনিং”—অর্থাৎ মহামারির একটি অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব।
কোভিড-১৯-এর সময় বিশ্বজুড়ে mRNA টিকা যেভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, তাতে চিকিৎসাবিদরা বুঝে গেছেন এই প্রযুক্তি শুধু ভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, আরও জটিল রোগের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে।
ক্যান্সার টিকা কীভাবে কাজ করে?
mRNA টিকা মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে শেখায় কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ধরনের কোষকে চিহ্নিত করে আক্রমণ করতে হয়। ঠিক যেমনটি হয়েছে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে। এখন গবেষকরা সেই একই মডেল ব্যবহার করে ক্যান্সারের কোষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন। তবে এখানে বিশেষত্ব হলো প্রতিটি টিকা হবে রোগীর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটাই একে “ব্যক্তিকৃত” করে তোলে। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, বেশ কিছু পরীক্ষামূলক ট্রায়াল আগেভাগেই শেষ হয়ে গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে টিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুধু দ্রুত নয়, সফলতাও দিচ্ছে।
লেনার্ড লি ও তার দল আশা করছেন ২০২৫ সালের মধ্যেই প্রথম অনুমোদিত ব্যক্তিকৃত mRNA ক্যান্সার টিকা বাজারে আনতে পারবেন। এটি সফল হলে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। যেখানে রোগ নির্ণয়ের পর শুধুমাত্র ওষুধ বা কেমোথেরাপি নয়, থাকবে একজন ব্যক্তির শরীর অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রতিষেধক টিকা—একেবারে নিখুঁত, লক্ষ্যে সঠিক ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম।
এই নতুন সম্ভাবনা শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য নয়, মানবজাতির জন্য এক বিশাল আশার আলো। প্রতিদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হাজারো মানুষের জীবনে এটি এনে দিতে পারে নতুন আশার সূর্যোদয়। আর খুব বেশি দেরি নয়। হয়তো আর এক বছরের মধ্যেই আমরা বলতে পারবো ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকা আর কল্পনা নয়, বাস্তব।


