“সময়” এই শব্দটি আমাদের অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি। আমরা ভাবি সময় এগোয় একমুখীভাবে, অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু বিজ্ঞান যদি হঠাৎ এসে বলে, “কিছু ঘটনা সময়ের আগেই ঘটে যায়”, তখন আমাদের অস্তিত্ব আর সময়ের ধারণা চূড়ান্তভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে। সম্প্রতি কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার এক বিস্ময়কর গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক তথ্য — “নেগেটিভ টাইম”। ফিজিক্সে সাধারণত সময় নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যকার ব্যবধান হিসেবেই, যেমন একটি আলোককণার একটি পরমাণুতে আঘাত করার পর, সেই পরমাণু কতক্ষণ উত্তেজিত অবস্থায় থাকে। কিন্তু কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ান্টাম অপটিক্স ল্যাবরেটরিতে চলমান গবেষণায় দেখা গেল, এই সময়কাল কখনো কখনো ‘শূন্য’রও কম!
এই গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক অ্যাফ্রেইম স্টেইনবার্গ ও তাঁর দল বিশেষ ধরনের লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফোটনের আচরণ বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, ফোটন যখন পরমাণুর সাথে সংঘর্ষ করে, তখন সেই পরমাণু কতক্ষণ উত্তেজিত অবস্থায় থাকে এবং এরপর শান্ত হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু পরিমাপের সময় দেখা গেল কিছু ফোটনের ঘটনাপরম্পরা এমনভাবে ধরা পড়েছে যে মনে হচ্ছে ঘটনা ‘শেষ’ হয়ে যাচ্ছে তার শুরু হওয়ার আগেই ।এই ধারণাকে সহজভাবে বোঝাতে গবেষকেরা এক আকর্ষণীয় উপমা দিয়েছেন, একটি টানেল, যেখানে গাড়ি প্রবেশ করছে ও বের হচ্ছে। গড়পড়তা হিসেবে প্রতিটি গাড়ি টানেলের এক পাশ দিয়ে ঢুকে কিছু সময় পরে অপর পাশে বের হবে। কিন্তু যদি দেখা যায়, কিছু গাড়ি বেরিয়ে আসছে ঢোকার আগেই — তাহলে? বাস্তবজগতে এটি অসম্ভব, কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এটি হয়ত সম্ভাব্য!
এই পরিমাপগুলো আগে ‘স্ট্যাটিস্টিকাল নয়েজ’ বা মাপজোখের গড়বির্তির কারণে বলে অবজ্ঞা করা হত। কিন্তু নতুন পরীক্ষার পদ্ধতি এতোটা নিখুঁত ছিল যে এই “নেগেটিভ টাইম” এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। না, এটি আবার সময় ভ্রমণ (Time Travel) বা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের বিপরীত কিছু নয়। গবেষকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন — কোনো তথ্য পেছনে ফিরে যাচ্ছে না, কোনো কণা আলোর গতিবেগ অতিক্রম করছে না। বরং এটি হচ্ছে কোয়ান্টাম ফেজ ও সম্ভাব্যতার অদ্ভুত খেলা। কোয়ান্টাম কণাগুলোর আচরণ সব সময় আমাদের ক্লাসিকাল যুক্তির বাইরে চলে যায়।
মূলত এখানে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, “ফেজ টাইম” — অর্থাৎ কোনো কণার কোয়ান্টাম তরঙ্গের অবস্থান এবং পরিবর্তনের গাণিতিক ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যায় দেখা যায়, কোনো কোনো তরঙ্গ এত অদ্ভুতভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তার ফলাফল সময়ের রৈখিক ধারাকে উপেক্ষা করে। এই আবিষ্কার কোনো রকেট বানানোর পথ খুলে দিচ্ছে না, কিংবা আমরা এখনই সময় পেছনে পাঠাতে পারবো না। কিন্তু এটি আমাদের সময়ের ধারণার ভেতরেই একটি ফাটল ধরাচ্ছে। সময় কি একটি পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা, না কি এটি শুধুই আমাদের উপলব্ধির সীমারেখা? নেগেটিভ টাইমের ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোয়ান্টাম বাস্তবতা আমাদের পরিচিত জগতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিশ্ব। যেখানে ঘটনাগুলো নির্দিষ্ট অনুক্রমে ঘটে না, যেখানে কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক ঘোলাটে।
অধ্যাপক স্টেইনবার্গ বলেন, “আমরা এমন এক ব্যাখা বেছে নিয়েছি যা আমাদের কাছে ফলপ্রসূ মনে হয়।” তাঁর এই মন্তব্য শুধু বিজ্ঞানের নয়, বরং দার্শনিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি বুঝিয়ে দেয়, আমরা যেভাবে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করি, সেটাও এক ধরনের নিজস্ব পছন্দ, নিজস্ব ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি। “নেগেটিভ টাইম” — এই শব্দই যেন সময়ের বুকে এক ধরনের বিদ্রোহ। এটি সময়কে আমাদের হাতের ঘড়ি থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় এক অদৃশ্য, অমূর্ত, সম্ভাবনার জগতে। যদিও এটি এখনো পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ এক বিস্ময়, তবে ভবিষ্যতে এই ধারণা হয়তো সময়ের আদি ও অন্তের পরিভাষাকে বদলে দেবে। আমাদের ভাবতে বাধ্য করবে — সময় কি সত্যিই একটি সোজা রেখা, না কি এক বহুমাত্রিক গোলক?


