মানুষ যখন যুদ্ধের শিকার হয় তখন শুধু শরীর রক্তাক্ত হয় না ভাষাও আক্রান্ত হয়। উপনিবেশিক ইতিহাসে যুদ্ধ কেবল ভূমি দখলের লড়াই ছিল না, চিন্তা, সংস্কৃতি ও ভাষার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠারও লড়াই ছিল। বিজিত জাতিকে যেভাবে দমন করা হয়, তার সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং দীর্ঘমেয়াদী অস্ত্র হলো ভাষা। ব্রিটিশরা ভারতে এবং ফরাসিরা আলজেরিয়ায় কেবল রাজনীতির মঞ্চে নয়, ভাষার মঞ্চেও যুদ্ধ চালিয়েছে।
১৮৩৫ সালের লর্ড ম্যাকলের “Minute on Indian Education” ভারতীয় ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো দলিল। ম্যাকলে লিখেছিলেন—
“We must do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern—a class of persons, Indian in blood and colour, but English in tastes, in opinions, in morals and in intellect.”
এই বক্তব্যের মধ্যে শুধুই শিক্ষানীতি নয়, উপনিবেশিক আধিপত্যের কৌশল লুকিয়ে ছিল। ইংরেজরা চায়নি পুরো ভারতবাসী ইংরেজি শিখুক। তারা চেয়েছিল এক শ্রেণির ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ তৈরি করতে যারা শাসকের ভাষা জানবে, তাদের মূল্যবোধ ধারণ করবে, কিন্তু শাসিতদের দলে থাকবে।
এই নীতির ফলাফল দেখা যায় শিক্ষাব্যবস্থায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি হয়ে ওঠে উন্নত শিক্ষা ও সরকারি চাকরির প্রধান মাধ্যম। বাংলাভাষা, সংস্কৃত, উর্দু বা ফার্সি যেগুলো উপমহাদেশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর অংশ ছিল সেগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তিক করে তোলা হয়।
এভাবেই ভাষা হয়ে উঠল শ্রেণিচ্যুতির হাতিয়ার। গ্রামীণ জনগণ, যারা আঞ্চলিক ভাষাতেই কথা বলত, তারা শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ল। একইসাথে জাতিগত দাঙ্গা, ভাষাগত বিভাজন বাংলা ও উর্দুর বিরোধ প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক ভাষানীতিরই অনিবার্য ফল।
১৮৩০ সালে আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশ শুরু হয় এবং ১৯৬২ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধক্ষেত্র।আলজেরিয়া ছিল একটি আরব-ইসলামিক সভ্যতা, যার ভিত্তি ছিল আরবি ভাষা ও ইসলামী শিক্ষা। ফরাসিরা খুব দ্রুত বুঝে ফেলে, যদি তারা এই ভাষার কাঠামো ভেঙে ফেলতে পারে, তাহলে আলজেরীয় জাতির আত্মপরিচয়ই নষ্ট হয়ে যাবে।
১৯৩৮ সালে ফরাসি সরকার আলজেরিয়ায় আরবি ভাষাকে একটি বিদেশি ভাষা বলে ঘোষণা দেয়। এমনকি ১৯৪৯ সালের এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আরবি কেবল একটি ধর্মীয় ভাষা, তার কোনও আধুনিক সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা নেই।” এই নির্দেশনা স্কুল, আদালত, সংবাদপত্র সবখানে আরবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে।
শুধু তাই নয়, ফরাসি প্রশাসন চেয়েছিল একটি নতুন ‘আধুনিক আলজেরীয়’ তৈরি করতে, যারা আরবি বা ইসলামিক চেতনার সঙ্গে নয়, বরং ফরাসি জাতিসত্তার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত মনে করবে। এখানেই ভাষা হয়ে উঠল সংস্কৃতিগত রূপান্তরের প্রধান অস্ত্র।
ব্রিটিশ ভারত বা ফরাসি আলজেরিয়া উভয় ক্ষেত্রেই ভাষানীতির লক্ষ্য ছিল মানসিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। শাসকের ভাষা যদি কারও চিন্তার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সে শাসকের জগতে চিন্তা করতে শেখে। এমনকি নিজ জাতিকে পিছিয়ে থাক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বা অশিক্ষিত ভাবতে থাকে। এ একধরনের ‘self-colonization’ বা আত্ম-উপনিবেশ।
এ কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘ইংরেজি জানা’ মানেই হয়ে দাঁড়ায় ‘সভ্য’, ‘শিক্ষিত’ এবং ‘যোগ্য’। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করে, যেটি তাকে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে ঠেলে দেয়। ফলত বাংলা, তামিল, উর্দু, পাঞ্জাবি সব ভাষায় সাহিত্যচর্চা কমতে থাকে এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি গড়ে ওঠে।
তবে এই ভাষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও ছিল। ভারতবর্ষে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে নানা চিন্তাবিদ বাংলা ভাষায় চিন্তা ও লেখালেখি চালিয়ে যান। আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ফ্রান্তজ ফ্যানন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যার বই “The Wretched of the Earth” ভাষা ও উপনিবেশের সম্পর্ক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করে। ফ্যানন দেখান, উপনিবেশিকরা কেবল শারীরিক নয়, ভাষার মাধ্যমে ‘মৌনতা’ চাপিয়ে দেয়। স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়, ভাষার অধিকার পুনরুদ্ধারও।
ব্রিটিশ ভারত ও ফরাসি আলজেরিয়া এই দুই উদাহরণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যুদ্ধ কেবল বন্দুক ও কামানের নয়; ভাষার, চিন্তার ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেরও। আজকের বিশ্বে যখন আমরা গ্লোবালাইজেশনের নামে আবারও এক ধরণের ভাষা আধিপত্য দেখি (ইংরেজি ভাষার প্রায় একাধিপত্য), তখন এই ইতিহাসকে মনে রাখা জরুরি। ভাষার স্বাধীনতাই আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। আর তাই আমাদের প্রতিটি শব্দচয়নেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর সিদ্ধান্ত—আমরা কার ভাষায় ভাবছি, কার ভাষায় বাঁচছি?


